Wednesday, 29 September 2021

আলা হযরতের জীবনী।(১ম খন্ড)



আ'লা হযরতের জন্ম



আমার আক্বা আ’লা হযরত, ইমামে আহলে সুন্নাত, ওলীয়ে নেয়ামত, আযিমুল বারকাত, আযিমুল মারতাবাত, পারওয়ানায়ে শময়ে রিসালাত, মুজাদ্দিদে দ্বীন ও মিল্লাত, হামিয়ে সুন্নাত, মাহিয়ে বিদ্আত, আলিমে শরীয়াত, পীরে তরীকত, বায়িছে খাইর ও বরকত, হযরত আল্লামা মাওলানা আল হাজ্ব, আল হাফিজ, আল ক্বারী,


 


▪ শাহ্ ইমাম আহমদ রেযা খান ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ১০ ই শাওয়াল ১২৭২ হিজরী, ১৪ই জুন ১৮৫৬ ইং রোজ শনিবার যোহরের সময় বেরেলী শহরের যাচুলী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম বৎসরের হিসাবে তাঁর ঐতিহাসিক নাম ‘আল মুখতার’ (১২৭২ হিঃ) (হায়াতে আ’লা হযরত, ১ম খন্ড, ৫৮ পৃষ্ঠা, মাকতাবাতুল মদীনা, বাবুল মদীনা, করাচী)



▪ আমার আক্বা আ’লা হযরত ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ নিজের জন্ম সাল ২৮ পারার সূরাতুল মুজাদালার ২২ নং আয়াত থেকে বের করেন। এই আয়াতে করীমার ‘ইলমে আবজাদ’ মোতাবেক সংখ্যা ১২৭২ আর হিজরী সাল মোতাবেক এটাই তাঁর জন্ম সাল।



▪ যেমন: মাকতাবাতুল মদীনা কর্তৃক প্রকাশিত “মলফুজাতে আ’লা হযরত” এর ৪১০ পৃষ্ঠায় বর্ণিত আছে: জন্মের তারিখ সমূহের আলোচনা ছিল এবং এর উপর (সায়্যিদী আ’লা হযরত বলেন: আল্লাহ তাআলার জন্য সকল প্রশংসা আমার জন্ম তারিখ এই আয়াতে করীমায় বিদ্যমান:


ﺃُﻭﻟَٰﺌِﻚَ ﻛَﺘَﺐَ ﻓِﻲ ﻗُﻠُﻮﺑِﻬِﻢُ ﺍﻟْﺈِﻳﻤَﺎﻥَ ﻭَﺃَﻳَّﺪَﻫُﻢ ﺑِﺮُﻭﺡٍ ﻣِّﻨْﻪُ আয়াত:


কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ- “ এরা ঐসব লোক যাদের অন্তরগুলোতে আল্লাহ ঈমান অংকিত করে দিয়েছেন এবং তাঁর নিকট থেকে রূহ দ্বারা তাঁদের সাহায্য করেছেন।”

আ'লা হযরতের কুরআন শিক্ষা ও প্রখর স্মৃতিশক্তি

____________________

আ'লা হযরতের কুরআন শিক্ষা ও প্রখর স্মৃতিশক্তি



জনাব সায়্যিদ আইয়ুব আলী শাহ সাহেব ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ বর্ণনা করেন: শৈশব কালে তিনি ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ কে পবিত্র কুরআন শিক্ষা দেয়ার জন্য জনৈক মাওলানা সাহেব তার ঘরে আসতেন। একদিনের বর্ণনা: মাওলানা সাহেব পবিত্র কুরআনের কোন আয়াতে করীমার কোন এক শব্দের হরকত তাঁকে বারবার বলার পরও তাঁর ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ মুখ থেকে তা বের করতে পারলেন না, বরং তাঁর মুখ মোবারক থেকে মাওলানা সাহেব যেরূপ বলেছিলেন তার বিপরীতই বের হল। মাওলানা সাহেব শব্দটিতে ‘যবর’ উচ্চারণ করলেন কিন্তু। আ’লা হযরত ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ তাতে “যের” উচ্চারণ করলেন। এ অবস্থা দেখে আ’লা হযরতের ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ পিতামহ হযরত মাওলানা রেযা আলী খান সাহেব ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ তাঁকে (আ’লা হযরত) ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ তাঁর নিকট ডাকলেন এবং কুরআন শরীফ আনার জন্য বললেন। তিনি কুরআন শরীফ খুলে দেখলেন যে, উক্ত শব্দে কোন লিখক ভুলে যেরের স্থানে যবর লিখে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আ’লা হযরতের পবিত্র জবানে যা উচ্চারিত হয়েছিল, তাই সঠিক ছিল। তাঁর পিতামহ তাঁকে (আ’লা হযরতকে) জিজ্ঞাসা করলেন: “বৎস! মাওলানা সাহেব তোমাকে যেরূপ বলেছিলেন তুমি সেরূপ বলনি কেন? আরজ করলেন: “আমি মাওলানা সাহেবের মত উচ্চারণ করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আমি আমার জবানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি।” আ’লা হযরত ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ নিজেই বলেছেন যে: আমার উস্তাদ যার থেকে আমি ইবতেদায়ী কিতাব সমূহ পড়তাম। যখন আমাকে সবক পড়ানো হত। আমি এক দু’বার দেখে কিতাব বন্ধ করে দিতাম। যখন সবক শুনতেন তখন অক্ষরে অক্ষরে শব্দে শব্দে শুনিয়ে দিতাম। প্রতিদিন এই অবস্থা দেখে তিনি খুবই আশ্চর্য হতেন। তিনি একদিন আমাকে বললেন: “প্রিয় বৎস আহমদ! তুমি বল, তুমি কি মানুষ না জ্বিন? আমার পড়াতে দেরী হয় কিন্তু তোমার মুখস্থ করতে দেরী হয় না!” তিনি ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ বললেন: “আল্লাহর তাআলার জন্য সকল প্রশংসা, আমি মানুষ। তবে আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ লাভে ধন্য হয়েছি।” (হায়াতে আ’লা হযরত, ১ম খন্ড, ৬৮ পৃষ্ঠা, মাকতাবাতুল মদীনা, বাবুল মদীনা, করাচী)


আল্লাহ তা‘আলার রহমত তাঁর উপর বর্ষিত হোক এবং তাঁর সদকায় আমাদের বিনা হিসাবে মাগফিরাত হোক।


ﺍٰﻣِﻴﻦ ﺑِﺠﺎ ﻩِ ﺍﻟﻨَّﺒِﻰِّ ﺍﻟْﺎَﻣﻴﻦ ﺻَﻠَّﯽ ﺍﻟﻠﮧُ ﺗَﻌَﺎﻟٰﯽ ﻋَﻠَﯿْﮧِ ﻭَﺍٰﻟِﮧٖ ﻭَﺳَﻠَّﻢ


ﺻَﻠُّﻮﺍ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﺤَﺒِﻴﺐ ! ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﺗَﻌَﺎﻟَﻰ ﻋَﻠﻰ ﻣُﺤَﻤَّﺪ






সফর মাসের শেষ বুধবারের আমল।



## প্রিন্ট কপি বের করে আমল করুন।

## আখেরি চাহার সম্বাহর দিন নিম্নের আয়াতে সালাম প্রত্যেক ফরজ নামাযের পর পাঠ করে সিনায় ফুঁক দিলে এবং কলা পাতায় বা কাগজে লিখে তা পানীয় জলে দিয়ে পান করলে আল্লাহর রহমতে বহু রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

আয়াতে সালাম

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ

سَلَامٌ عَلٰى نُوْحٍ فِى الْعَالَمِيْنড় اِنَّا كَذٰلِكَ نَجْزِى الْمُحْسِنِيْنَড় سَلَامٌ عَلٰى اِبْرَاهِيْمড় اِنَّا كَذٰلِكَ نَجْزِى الْمُحْسِنِيْنَড় سَلَامٌ عَلٰى مُوْسٰى وَ هَارُوْن اِنَّا كَذٰلِكَ نَجْزِى الْمُحْسِنِيْنَড় سَلَامٌ عَلٰى اِلْيَاسِيْنَড় اِنَّا كَذٰلِكَ نَجْزِى الْمُحْسِنِيْنَ ড়سَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِيْنَড় سَلَامٌ عَلَيْكُمْ طِبْتُمْ فَادْخُلُوْهَا خَالِدِيْنَ سَلَامٌ هِىَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ

এ দিন গোসল করার পর একটি পবিত্র ও পরিষ্কার পাত্রে পানি নিয়ে কলাপাতা বা কাগজে নি¤েœর দু‘আ ও নক্সা লিখে পাত্রের পানিতে ডুবিয়ে অতঃপর কোমর পর্যন্ত পানিতে দাঁড়িয়ে মাথার উপর পানি ঢালবেন। আল্লাহর ফজলে রোগ-ব্যাধি থেকে এর দ্বারা নিরাপদ থাকবেন।

দু‘আ ও নক্সা

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ

اِنَّ اللهَ يُمْسِكُ السَّمَوَاتِ وَالْاَرْضِ اَنْ تَزُوْلَا وَلَئِنْ زَالَتَا اِنْ اَمْسَكَهُمَا مِنْ اَحَدٍ مِّنْ بَعْدِهِ اِنَّهُ كَانَ حَلِيْمًا غَفُوْرًا

۲ ۹ ۴

۷ ۵ ۳

۶ ۱ ۸

হিংসার ভয়াবহ পরিণতি।

 


# ইসলামে হিংসার পরিণাম ভয়াবহ:


## হিংসা একটি ধ্বংসাত্মক কু-অভ্যাস। মানুষকে কলুষিত করার জন্য এই একটি বদঅভ্যাসই যথেষ্ট। তাইতো আমাদের দৈনন্দিন জীবনে চলার পথে আমরা কত বিচিত্র স্বভাবের মানুষই না দেখতে পাই। আমাদের মধ্যে এমন অনেক লোকও আছেন যারা অন্যের ভালো একেবারেই সহ্য করতে পারেন না। অন্যের ভালো কিছু দেখলে হিংসায় জ্বলে-পুড়ে একাকার হয়ে যান। মানবজাতির এই হিংসা প্রবণতা এক প্রকার ব্যাধি; যা ইসলামের দৃষ্টিতে মারাত্মক পাপের কাজ, অবশ্যই বর্জনীয় এবং সম্পূর্ণরূপে হারাম। এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনে সুরা ফালাকের ৫নং আয়াতে আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘আর (আমি আশ্রয় চাই) হিংসুকের অনিষ্ট থেকে, যখন সে হিংসা করে।’ এ মর্মে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘সন্দেহ নেই, হিংসা নেক আমলগুলোর নুর ও আলোকে নিভিয়ে দেয়’- (সুনানে আবু দাউদ : ৪৯০৬)। এ ছাড়াও হজরত আনাস বিন মালিক (রা.) হতে বর্ণিত নবী (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পরে বিদ্বেষ করো না, হিংসা করো না, ষড়যন্ত্র করো না ও সম্পর্ক ছিন্ন করো না। বরং তোমরা আল্লাহর বান্দা হয়ে যাও, পরস্পর ভাই ভাই হয়ে যাও’- (বুখারি : ৬০৭৬, মুসলিম: ২৫৫৯, জামে তিরমিজি: ১৯৩৫)।



 

মানুষের অন্যতম খারাপ অভ্যাস হলো অন্যের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করা। ইসলামে হিংসা বা বিদ্বেষ পোষণকারীকে খুবই নিকৃষ্ট চোখে দেখা হয়েছে। তাইতো হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা হিংসা-বিদ্বেষ করা থেকে বেঁচে থাকো। কেননা হিংসা নেক আমলকে সেভাবে খেয়ে ফেলে যেভাবে আগুন কাঠকে জ্বালিয়ে নিঃশেষ করে দেয়’- (সুনানে আবু দাউদ : ৪৯০৫)। হজরত যামরাহ্ বিন ছালাবাহ (রা.) বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ ততক্ষণ পর্যন্ত কল্যাণের মধ্যে থাকবে, যতক্ষণ তারা পরস্পরে হিংসা না করবে’- (তাবারানি: ৮১৫৭, ছহিহাহ: ৩৩৮৬)।


মানুষ হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকুক এবং মানব সমাজে সামাজিক শান্তি-সম্প্রীতি বজায় থাকুক এটাও আল্লাহ তায়ালার একান্ত অভিপ্রায়। তাইতো তিনি কোরআনের সুরা আন-নিসার ৫৪নং আয়াতে ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দিয়েছেন, সে জন্য কি তারা তাদের ঈর্ষা করে?’ একজন প্রকৃত ইমানদার ব্যক্তি কখনো হিংসার বশবর্তী হতে পারেন না। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণিত রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘মোমিন বান্দার পেটে আল্লাহর রাস্তার ধুলা এবং জাহান্নামের আগুন একত্রে জমা হতে পারে না। একইভাবে হিংসা এবং ঈমানও কোনো বান্দার মাঝে একত্রে থাকতে পারে না’- (নাসাই)। এ ছাড়াও হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে আরো একটি হাদিসে বর্ণিত রাসুল (স.) বলেছেন, ‘কোনো বান্দার হৃদয়ে ঈমান ও হিংসা একত্রে থাকতে পারে না’- (সুনানে নাসাই: ৩১০৯)।


মানুষের বদভ্যাস সম্পর্কে রাসুল (সা.) বলেছেন, তিনটি বদভ্যাস আছে, যা থেকে কেউ মুক্ত নয়। ১. কু-ধারণা ২. হিংসা ৩. অশুভ ফলাফলে বিশ্বাস। সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর রাসুল, এসব থেকে মুক্ত থাকার উপায় কী? তিনি বললেন, ‘কারো প্রতি কু-ধারণা এলে তা বিশ্বাস না করা, হিংসার উদ্রেক হলে প্রকাশ না করা আর কাজ থেকে ফিরে না আসা’- (মাজমাউজ জাওয়াইদ)।


হিংসা এমন একটি খারাপ অভ্যাস যা মানুষের নৈতিক চরিত্র তো ধ্বংস করেই তার সঙ্গে ধর্মীয় অনুভূতিগুলোকেও ধ্বংস করে দেয়। তাইতো নবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা হিংসা থেকে বেঁচে থাক। কারণ হিংসা দীন ধ্বংস করে দেয়’- (তিরমিজি)। এ ছাড়াও হজরত জুবায়ের ইবনুল আওয়াম (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে পিপীলিকার মতো প্রবেশ করবে বিগত উম্মতদের রোগ। আর তা হলো হিংসা ও বিদ্বেষ; যা হলো মু-নকারী। আমি বলি না যে চুল মু-ন করবে, বরং তা দীনকে মু-ন করে ফেলবে’- (তিরমিজি: ৫০৩৯)।


হিংসুকরা আল্লাহর নিয়ামতের শত্রু, গোটা মোমিনের শত্রু। তাইতো রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর নিয়ামতের শত্রু আছে।’ সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, আল্লাহর নিয়ামতের শত্রু কারা? রাসুল (সা.) বললেন, ‘হিংসুকরা। হিংসুক তো এজন্যই হিংসা করে- আল্লাহ কেন তার বান্দাকে অনুগ্রহ করেছেন’- (দাওয়াউল হাসাদ)। এ ছাড়াও ইমাম বাকির (রহ.) বলেন, ‘হিংসা ইমানকে জ্বালিয়ে নিঃশেষ করে দেয়’- (আল কাফি, খ- ২, পৃষ্ঠা-৩০৬, হাদিস নং-১)। হিংসার পরিণাম সম্পর্কে ইমাম জাফর সাদিক (রহ.) বলেন, ‘একে অপরের সঙ্গে হিংসা করা থেকে বিরত থাকো, কেননা হিংসা হলো কুফরের ভিত্তিস্বরূপ’- (আল কাফি, খ- ৮, পৃষ্ঠা-৮, হাদিস নং-১)। হিংসুক বান্দাহদের আল্লাহতায়ালা ক্ষমা করবেন না আর ইহকাল ও পরকালে তাদের পরিণতি ভয়াবহ। তাইতো নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘অর্ধ শাবানের রাতে (অর্থাৎ শবেবরাতে) আল্লাহতায়ালা তার সব সৃষ্টিকেই ক্ষমা করে দেন। তবে তিনি মুশরিক ও হিংসা-বিদ্বেষপোষণকারীকে ক্ষমা করেন না’- (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৩৯০)।


পরিশেষে বলা যায় যে, হিংসা মানুষের একটি আত্মিক রোগ। যা মরণ-ব্যাধির চেয়েও ভয়ংকর। এই হিংসাই মানব আত্মাকে দূষিত ও কলুষিত করে এবং সব নেক আমলকে নষ্ট করে দেয়। অতএব সব মানব সন্তানেরই হিংসা-বিদ্বেষ থেকে দূরে থাকা অবশ্য কর্তব্য।

Tuesday, 28 September 2021

হযরত আমিরে মুআভিয়া রাদিআল্লাহু তায়ালা আনহুর ফজিলত।

 ## আমীর মু‘আভিয়ার ফযীলত সম্পর্কে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে-


এক.ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল হযরত আবরাজ ইবনে সারিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম দো‘আ করেছেন, ‘হে আল্লাহ্! মু‘আভিয়াকে কিতাব (ক্বোরআন) ও অংকের জ্ঞান দান করুন এবং তাকে আযাব থেকে রক্ষা করুন।’’

দুই. তিরমিযী শরীফে হযরত আবদুর রহমান ইবনে আবূ আমীরাহ্ মাদানী থেকে বর্ণনা করেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আরো দো‘আ করেছেন, ‘‘হে আল্লাহ্, মু‘আভিয়াকে হেদায়তপ্রাপ্ত ও হিদায়তদাতা করে দাও! এবং মু‘আভিয়ার মাধ্যমে জনগণকে হিদায়ত দান করো।’’ ইমাম তিরমিযী এ হাদীসকে ‘হাসান’ পর্যায়ের বলেছেন।

তিন. হাফেয হারিস ইবনে উসামা এক দীর্ঘ হাদীস রেওয়ায়ত করেছেন, যার মধ্যে খোলাফা-ই রাশেদীন ও অন্যান্য সাহাবা-ই কেরামেরও ফযীলতসমূহ বর্ণিত হয়েছে। ওই হাদীসে এটাও আছে-

وَمُعَاوِيَةُ بْنُ اَبِىْ سُفْيَانَ اَعْلَمُ اُمَّتَِىْ وَاَجْوَدُهَا

অর্থাৎ মু‘আভিয়া আমার উম্মতের বড় জ্ঞানী, দয়ালু ও দানবীর।

চার. ইমাম ত্বাবারী স্বীয় সিয়র গ্রন্থে একটি দীর্ঘ হাদীস উদ্ধৃত করেছেন। তাতে খোলাফা-ই রাশেদীন ও ‘আশারাহ্-ই মুবাশ্শারাহ্র ফযীলতসমূহ বর্ণিত হয়েছে। এ হাদীসের শেষ প্রান্তে এটাও আছে-

وَصَاحِبُ سِرِىْ مُعَاوِيَةُ بْنُ اَبِىْ سُفْيَانَ ـ

فَمَنْ اَحَبَّهُمْ فَقَدْ نَجٰى وَمَنْ اَبْغَضَهُمْ فَقَد هَلَكَ

অর্থ: ‘‘আমার গোপনীয় বিষয়াদির সংরক্ষক হলো মু‘আভিয়া ইবনে আবূ সুফিয়ান। যে ব্যক্তি তাদের সবাইকে ভালবাসবে সে নাজাত পাবে, আর যে তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করবে, সে ধ্বংস হয়ে যাবে।’’

চার. হাফেয ইমাম হায়তমী হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমার সূত্রে বর্ণনা করেছেন, একদা হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম স্বীয় পবিত্র স্ত্রী উম্মে হাবীবা (রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা)’র নিকট তাশরীফ নিয়ে গেলেন। দেখলেন তিনি আপন সহোদর আমীর মু‘আভিয়ার মস্তক আপন কোলে নিয়ে বসে আছেন এবং তাঁকে বারংবার ¯েœহভরে চুমু দিচ্ছেন। তখন হুযূর-ই আক্রাম এরশাদ করলেন, ‘‘হে উম্মে হাবীবাহ্! তুমি কি মু‘আভিয়াকে ¯েœহ করছো?’’ তিনি আরয করলেন, ‘‘জী-হাঁ। সে আমার সহোদর (ভাই)।’’ হুযূর-ই আক্রাম এরশাদ করলেন, ‘‘আল্লাহ্ এবং তাঁর রসূলও মু‘আভিয়াকে ভালবাসেন।’’

পাঁচ. আবূ বকর ইবনে আবূ শায়বাহ্ স্বয়ং আমীর মু‘আভিয়া থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, একদা হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘‘হে মু‘আভিয়া, যদি তুমি বাদশাহ হও, তবে কল্যাণ করো।’’ তখন থেকে আমার দৃঢ় বিশ্বাস হয়ে গেলো যে, আমার বাদশাহী মিলবে।

ছয়. আবূ ইয়া’লা হযরত আমীর মু‘আভিয়া থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, আমাকে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘‘হে মু‘আভিয়া, যদি তুমি শাসক (বাদশাহ্) হও, তবে আল্লাহকে ভয় করো এবং ন্যায় বিচার করো।’’ কিছুটা পার্থক্য সহকারে এ হাদীস ‘মুসনাদে ইমাম আহমদ’-এও বর্ণিত হয়েছে।

সাত. ইমাম ত্বাবরানী ‘আওসাত্ব’ গ্রন্থে হযরত আমীর মু‘আভিয়া রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেন, হুযূর-ই আক্রাম আমার উদ্দেশে এরশাদ করেছেন, ‘‘হে মু‘আভিয়া, যদি তুমি শাসক হও, তাহলে অপরাধীদেরকে যথাসম্ভব ক্ষমা করে দিও, নেক্কার লোকদের নেকী গ্রহণ করিও।’’

এ রেওয়ায়ত ভিন্ন ভিন্নভাবে অনেক কিতাবে মওজুদ আছে।


Saturday, 25 September 2021

ফেরেশতাগণ নূরের তৈরী।

 

 



##ফেরেশতাগণ নূরের সৃষ্টি:



عَنْ عَائِشَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهَا عَنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى الله عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ خُلقَتِ الْمَلَائِكَةُ مِن نُوْرِ وخُلِقَ الْجَانّ من مَّارِج مِّنْ نَار وخُلِقَ اَدَمُ مِمَّا وُصِفَ لَكُمْ- (رواه مسلم)

عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّ اللهُ عَلَيْهِ وسَلَّمَ مَا مِنْ يَوْمٍ يُصْبِحُ العِبَادُ اِلَّا مَلَكَانِ يَنْزِلَان فَيَقُوْلُ اَحَدُهُمَا اَللَّهُمَّ اَعْطِ مُنْفِقًا خَلَفًا وَيَقُوْلُ الاخر اَعْطِ مُمْسِكًا تَلَفًا- (رواه البخارى و مسلم)

অনুবাদ: হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ফেরেশতাদেরকে নূর থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে, জ্বীন সৃষ্টি হয়েছে কালো ধোঁয়া মিশ্রিত আগুন থেকে। আর আদম সৃষ্টি সম্পর্কে তোমাদেরকে বর্ণনা দেয়া হয়েছে। [মুসলিম শরীফ] হযরত আবূ হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যখনই আল্লাহর বান্দারা প্রত্যুষে শয্যা ত্যাগ করে তখনই দু’জন ফেরেশতা অবতীর্ণ হন। তন্মধ্যে একজন বলতে থাকেন, হে আল্লাহ্! তুমি দাতা ব্যক্তিকে প্রতিদান দাও। অন্যজন বলতে থাকেন, হে আল্লাহ্! কৃপণ ব্যক্তিকে ধ্বংস করো। [বুখারী ও মুসলিম শরীফ]


প্রাসঙ্গিক আলোচনা


বর্ণিত হাদীসদ্বয়ে ফেরেশতার সৃষ্টির বর্ণনা ও তাঁদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের বর্ণনা আলোকপাত হয়েছে, জেনে রাখুন, ফেরেশতারা আল্লাহ্র নূরের সৃষ্টি। তাঁদের প্রতি ঈমান রাখা ইসলামের মৌলিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। ক্বোরআন ও হাদীসের আলোকে ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান আল্লাহ্র প্রতি ঈমানের পূর্ণতার প্রমাণ। তাঁদের অস্বীকার করা কুফরীর নামান্তর। ফেরেশতারা আল্লাহ্র সম্মানিত বান্দা।

ফেরেশতার সংজ্ঞা: আরবি মালাকুন শব্দের অর্থ ফেরেশতা। এবং বহুবচন মালায়িকা, ফেরেশতাগণ আল্লাহর এক প্রকার সম্মানিত সৃষ্টি। ইসলামী শরীয়তের পরিভাষায়-اَلْمَلَائِكَةُ جِسْمٌ نُوْرِىٌّ متشكل بِاشكَالٍ مُختلفَةٍ لَا يَعْصُوْنَ اللهَ مَا اَمَرَهُمْ وَ يَفْعَلُوْن مَا يُؤمَرُؤنَ- (قواعد الفقه)

অর্থ: ফেরেশতাগণ জ্যোতির্ময় সুক্ষ্ম দেহের অধিকারী নূরের সৃষ্টি। যাঁদের বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। যারা আল্লাহর নির্দেশের বিরুদ্ধাচরণ করে না। সর্বদা আল্লাহর নির্দেশ পালনে নিয়োজিত থাকেন। [কাউয়ায়েদুল ফিকহ্] বুখারী শরীফের ব্যাখ্যায় আল্লামা ইবনে হাজর আসকালানী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি’র মতে ফেরেশতার এক অর্থ “বার্তা বাহক” তাঁদের অবস্থানস্থল আসমানী জগত।

[ফাতহুলবারী খন্ড- ৬, পৃষ্ঠা ২৩২]


ফেরেশতাদের ব্যাপারে যে ধরনের ঈমান রাখা অপরিহার্য

* ফেরেশতাদের অবিশ্বাস করলে মু’মিন হিসেবে গণ্য হবে না।

* তাঁরা আল্লাহর নূরের সৃষ্টি।

* তারা পুরুষও নন, নারীও নন।

* ফেরেশতাদের কোন সন্তান-সন্ততি নেই।

* তাঁরা পানাহার করে না, তাঁদের তন্দ্রাও নেই, নিদ্রাও নেই।

* তারা সর্বপ্রকার গুনাহ্ থেকে পুতঃপবিত্র। সকলেই মাসুম বা নিষ্পাপ।

* তাঁরা বিভিন্ন আকৃতি ধারণ করতে পারেন। (কুকুর ও শূকর ব্যতীত)

* ফেরেশতাদের প্রকৃত সংখ্যা আল্লাহ্ ব্যতীত কারো জানা নেই।

* আল্লাহ্র ইবাদত-বন্দেগীতে নিয়োজিত থাকা তাঁদের প্রধান কাজ।

* ফেরেশতারা আল্লাহ্ যা বলেন, তা ছাড়া নিজ এখতিয়ারে কিছু করতে পারেন না।

* হযরত জিবরীল আলায়হিস্ সালাম বিভিন্ন আকৃতিতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র দরবারে উপস্থিত হতেন। অধিকাংশ সময় হযরত দেহইয়া কালবী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু’র আকৃতিতে আসতেন। [আল্ হিদায়াতুল মুবারাকা ফী তাখলীকে মালায়িকা: কৃত- ইমাম আহমদ রেযা রাহমাতুল্লাহি আলায়হি]


আল্ ক্বোরআনে ফেরেশতাদের বর্ণনা


ফেরেশতাগণ তাওহীদ তথা একত্ববাদের সাক্ষ্য দাতা। আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন-

شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لاَ إِلَهَ إِلاَّ هُوَ وَالْمَلائِكَةُ وَأُوْلُواْ الْعِلْمِ-

‘‘আল্লাহ্ সাক্ষ্য দেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ্ নেই, ফেরেশতাগণ এবং জ্ঞানীগণ (এই সাক্ষ্য দেন)। [সূরা: আলে ইমরান, আয়াত- ১৮] ফেরেশতাদের পরিচয় হলো তাঁরা আল্লাহর সম্মানিত বান্দা। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন- بَلْ عِبَادٌ مُّكْرَمُونَ-

‘‘বরং তারা (ফেরেশতারা) আল্লাহর সম্মানিত বান্দা।’’ [সূরা: আম্বিয়া, আয়াত- ২৬] আল্লাহ্র নির্দেশের বাইরে কোন কাজ তারা করেন না। তাঁরা আল্লাহ্র একান্ত অনুগত সৃষ্টি কোন প্রকার নাফরমানী তাঁরা করেন না। এরশাদ হয়েছে-

لَا يَعْصُوْنَ اللهَ اَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُوْنَ مَا يُؤمَرُوْنَ-

তাঁরা আল্লাহ্ নির্দেশের বিরুদ্ধাচারণ করেন না। আল্লাহ্ যা আদেশ করেন তাই তাঁরা পালন করেন। [সূরা: নাহল, আয়াত- ৫০]


ফেরেশতাদের অবিশ্বাস করা কুফরী


ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান রাখা ঈমানের সপ্ত মূলনীতির অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র ক্বোরআনে এরশাদ হয়েছে-

وَمَن يَكْفُرْ بِاللَّهِ وَمَلائِكَتِهِ وَكُتُبِهِ وَرُسُلِهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلالاً بَعِيدًا-

অর্থ: যে আল্লাহ্ তাঁর ফেরেশতাগণ, তাঁর কিতাব সমূহ,তাঁর রাসূলগণ ও পরকালকে অবিশ্বাস করবে সে ভীষণভাবে পথভ্রষ্ট হয়ে পড়বে। [সূরা: নিসা, আয়াত- ১৩৬] ফেরেশতার সংখ্যা

ফেরেশতাদের সংখ্যা আল্লাহ্ ব্যতীত কারো জানা নেই। আল্লাহ্ তা‘আলা অসংখ্য ফেরেশতা সৃষ্টি করেছেন। এ প্রকৃত সংখ্যা তিনিই জ্ঞাত। তবে পবিত্র ক্বোরআনে আল্লাহ্ তা‘আলা কিছু সংখ্যক ফেরেশতাদের নাম উল্লেখ করেছেন। যেমন সূরা বাকারায় জিবরীল আলায়হিস্ সালাম, মিকাঈল আলায়হিস্ সালাম, হারুত ও মারুত আলায়হিমাস্ সালাম ফেরেশতাদের নাম উল্লেখ হয়েছে। এরশাদ হয়েছে- مَن كَانَ عَدُوًّا لِّلَّه وَمَلائِكَتِهِ وَرُسُلِهِ وَجِبْرِيلَ وَمِيكَالَ فَإِنَّ اللَّهَ عَدُوٌّ لِّلْكَافِرِينَ-

অর্থ: যে কেউ আল্লাহর তাঁর ফেরেশতাগণের তাঁর রাসূলগণের এবং জিবরীল মিকাঈলের শত্রু, সে জেনে রাখুক নিশ্চয় আল্লাহ্ কাফিরদের শত্রু। [সূরা: বাক্বারা, আয়াত- ৯৮]


চার ফেরেশতার বিশেষ দায়িত্ব


আল্লাহ্ তা‘আলা চার জন ফেরেশতাকে বিশেষ মর্যাদা ও দায়িত্ব দিয়েছেন।

১. হযরত জিবরীল আলায়হিস্ সালাম তিনি আল্লাহর নিকট থেকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সহ সম্মানিত নবী-রাসূলণের নিকট ওহী আনয়ন করেছেন। তিনি নবীজির দরবারে চব্বিশ হাজার বার ওহী নিয়ে এসেছেন।

২. হযরত মিকাঈল আলায়হিস্ সালাম’র দায়িত্ব হলো- সৃষ্টি জাতের খাদ্য-দ্রব্যের ব্যবস্থাপনা করা। মেঘমালা প্রস্তুতকরণ, বৃষ্টি বর্ষণ, আল্লাহর নির্দেশক্রমে সৃষ্টি জগতের জীবিকা সরবরাহের দায়িত্বে নিয়োজিত।

৩. হযরত ইসরাফীল আলায়হিস্ সালাম’র দায়িত্ব হলো- আল্লাহর নির্দেশে কিয়ামতের পূর্বক্ষণে সিঙ্গায় ফুৎকার দেওয়া। বিশ্বজগতের আয়ুস্কাল সমাপ্তির সাথে সাথে তিনি সিঙ্গায় ফুৎকার দিবেন। শেষ বিচারের দিনেও ফুৎকার দিবেন। এরশাদ হয়েছে-

يَوْمَ يُنفَخُ فِي الصُّورِ فَتَأْتُونَ أَفْوَاجًا-

৪. হযরত আযরাঈল আলায়হিস্ সালাম’র দায়িত্ব পবিত্র ক্বোরআন ও হাদীসে তাঁকে ‘মালাকুল মওত’’ (মৃত্যুর ফেরেশতা) বলা হয়েছে। বিশ্বজগতের রূহ কবজ করা তাঁর দায়িত্ব। পবিত্র ক্বোরআনে এরশাদ হয়েছে-

قُلْ يَتَوَفَّاكُم مَّلَكُ الْمَوْتِ الَّذِي وُكِّلَ بِكُمْ ثُمَّ إِلَى رَبِّكُمْ تُرْجَعُونَ-

অর্থ: (হে হাবীব) আপনি বলুন! তোমাদের জন্য নিযুক্ত মৃত্যুর ফেরেশতা তোমাদের প্রাণ হরণ করবে। অবশেষে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে। [সূরা: সাজদা, আয়াত- ১১]


কবরের ফেরেশতা মুনকার ও নাকীর


মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর কবরে মুনকার ও নাকীর নামে দু’জন ফেরেশতা কবরবাসীর নিকট সওয়াল-জওয়াব এর দায়িত্ব পালন করেন। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে-

اِذَا اُقْبِرَ الْميتُ اَتَاهُ مَلَكَانِ اسَوَادَانِ اَزْرَاقَانِ يُقَالُ لِاحدِهما الْمُنْكَرُ والاخر النكير- فيسئلان عَنْ رَبّهِ وَدِينه ونبيه-

নবীজি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, যখন মৃত ব্যক্তিকে কবস্থ করা হয়। তখন কালো নীল চক্ষু বিশিষ্ট দু’জন ফেরেশতা আগমন করেন। একজনকে বলা হয় মুনকার, অন্যজনকে নাকীর অতঃপর তাঁরা তার রব, দ্বীন ও নবী সম্পর্কে প্রশ্ন করেন।

ফেরেশতারা সর্বদা নবীজির উপর দরূদ শরীফ পাঠ করেন

দরূদ শরীফ এক উত্তম ও বরকতময় আমল। স্বয়ং আল্লাহ্ তা‘আলা ও তাঁর অসংখ্য ফেরেশতারা তাঁর প্রিয় হাবীবের উপর সর্বদা দরূদ শরীফ পাঠ করেন। পবিত্র ক্বোরআনে আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন-

إِنَّ اللَّهَ وَمَلائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِىِّ الاية-

‘‘আল্লাহ্ নবীর প্রতি রহমত বর্ষণ করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও নবীর উপর দরূদ পাঠ করেন। [সূরা: আহযাব, আয়াত- ৫৬] ফেরেশতাগণ মু’মিনদের জন্য রহমত কামনা করেন ও ক্ষমা প্রার্থনা করেন। পবিত্র ক্বোরআনে এরশাদ হয়েছে-

هُوَ الَّذِي يُصَلِّي عَلَيْكُمْ وَمَلائِكَتُهُ لِيُخْرِجَكُم مِّنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّورِ وَكَانَ بِالْمُؤْمِنِينَ رَحِيمًا-

‘‘তিনি আল্লাহ্ তোমাদের প্রতি রহমত করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও তোমাদের জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করে অন্ধকার হতে তোমাদেরকে আলোতে আনার জন্য এবং তিনি মু’মিনদের প্রতি পরম দয়ালু। [সূরা: আহযাব, আয়াত- ৪৩] নবীজি ফেরেশতাকে দেখেন

নবীজি হযরত জিবরীল আলায়হিস্ সালামকে তাঁর প্রকৃত আকৃতিতে দু’বার দেখেছেন। মক্কার পাহাড়ের উপত্যকায় একবার, দ্বিতীয়বার মি’রাজ রজনীতে সিদরাতুল মুনতাহা নামক স্থানে। আল্লাহ্ তা’আলা এরশাদ করেন-وَلَقَدْ رَآهُ بِالأُفُقِ الْمُبِينِ-

অর্থ: আর তিনি (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) জিবরীলকে স্পষ্ট দিগন্তে দেখেছেন। [সূরা: তাকভীর, আয়াত- ২৩] وَلَقَدْ رَآهُ نَزْلَةً أُخْرَى- عِندَ سِدْرَةِ الْمُنتَهَى- ‘‘নিশ্চয়ই তিনি (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) তাঁকে জিবরীলকে আরেকবার দেখেছিলেন।

[সূরা: নাজম, আয়াত- ১৩-১৪] তখন রূহুল আমীন হযরত জিবরীল আলায়হিস্ সালাম’র ছয়শত ডানা বিশিষ্ট বৃহদাকার আকৃতিতে পৃথিবী ও আকাশের মধ্যবর্তী স্থান পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে- وَقَدْ اَخرجَ مُسلم و البخارى عَنْ عبد الله بنُ مسعُود رضى اللهُ عَنْهُ اَنَّ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَرَاى جِبْرِئيلَ عَلَيْهِ السَّلام لَهُ سِتٌّمِائَة جَنَاحِ-

হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম জিবরীল আলায়হিস্ সালামকে ছয়শত ডানা বিশিষ্ট অবস্থায় দেখেছেন। [ফাতহুল বারী: খন্ড- ২, পৃষ্ঠা- ২৪২]


ফেরেশতাদের মৃত্যু


পবিত্র ক্বোরআনে আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেন- كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوتِ- প্রত্যেকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করবে। [সূরা: আল্ ইমরান, আয়াত- ১৮৫] যখন এ আয়াত অবতীর্ণ হলো, ফেরেশতারা জানলো, তাঁরাও মৃত্যুবরণ করবে। ইমাম রাযী তাফসীরে কবীরে ইবনে জরীর থেকে বর্ণনা করেন-

وَكُلّ مَلَكَ الْمَوت بِقَبْضِ اَرْوَاحِ الْمُؤمِنِيْنَ وَالمَلَائِكَة-

মালাকুল মাওত মুসলমান ও ফেরেশতাদের রূহ কবজ করবেন, তবে ফেরেশতাগণ কিয়ামত পর্যন্ত জীবিত থাকার বিষয়টি অসংখ্য হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। কিয়ামতের পূর্বে কোন ফেরেশতার মৃত্যু হবে না। হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে হাদীস বর্ণিত হয়েছে-

وَالْمَلَائِكَةُ يَمُوْتُوْنَ فِى الصَّعْقَه الْاُولى واَنَّ مَلَكَ الموتِ يقبَضُ اَرْوَاحَهُمْ ثُمَّ يَمُوْتُ-

শিংগায় যখন প্রথম ফুৎকার দেওয়া হবে,মালাকুল মাওত ফেরেশতাদের রূহ কবজ করবেন। অতঃপর তিনিও মৃত্যু বরণ করবেন।

হযরত আবূ হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন-

اَخِرُهُمْ مُوتًا مَلَكَ الْمَوْت-

ফেরেশতাদের মধ্যে সর্বশেষ মালাকুল মাওত এর মৃত্যু হবে। আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ থেকে নির্দেশ হবে মরে যাও, তখন তিনিও মৃত্যু বরণ করবেন। তবে শেখুল আকবর মুহিউদ্দীন ইবনুল আরবী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি ও হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাজ্জালী রাহমাতুল্লাহি আলায়হি সহ একদল মনীষীদের মতে ফেরেশতারা হলেন, ‘রূহ’ সদৃশ্য রূহের মৃত্যু হয় না। দেহের মৃত্যু হয়। সুতরাং ফেরেশতার সাথে মৃত্যুর কোন সম্পর্ক নেই। এটাই বিশুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য অভিমত। আল্লাহ্ তা‘আলা অধিক জ্ঞাত। [আল্ হিদায়াতুল মুবারাকা ফী তাখলীকে মালায়িকা: কৃত- ইমাম আহমদ রেযা (রাহ.)] হে আল্লাহ্ ফেরেশতাদের প্রতি আমাদের পরিপূর্ণ ঈমান নসীব করুন- আমীন। বেহুরমাতি সৈয়্যাদিল মুরসালীন।


সুন্নাহ সালাতের ফজিলত।

 


 



##সুন্নাত নামাযের ফজীলত:


عَنْ عَائِشَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ ثَابَرَ عَلَى ثِنْتَىْ عَشَرَةَ رَكَعَةً مِنَ السُّنَةِ بَنَى لَهُ بَيْتٌ فِىْ الْجَنَّةِ اَرْبَعٌ قبلَ الظَّهْرِ وَرَكَعَتَيْنِ بَعْدَ الظّهرِ وَرَكَعْتَيْنِ بَعْدَ الْمغرِبِ وَركعتينِ بَعْدَ الْعِشَاءِ وَرَكَعْتَيْنِ قَبْلَ الْفَجْرِ– (رواه ابن ماجه) عَنْ عَائِشَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمْ رَكَعْتَا الْفجر خيرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا فِيْهَا- (رواه مسلم- ٤٥٠١/١)

অনুবাদ: হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি বার রাকা‘আত সুন্নাত নামায নিয়মিত আদায় করে তার জন্য জান্নাতে একখানা ঘর তৈরী করা হবে। তাহলো জোহরের আগে চার রাকা‘আত, জোহরের পরে দুই রাকা‘আত, মাগরিবের পরে দুই রাকা‘আত, এশার পরে দুই রাকা‘আত, এবং ফজরের আগে দুই রাকা‘আত। [ইবনে মাযাহ্, ১ম খন্ড, হাদীস নং-১১৪০] হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ফজরের দুই রাকা‘আত সুন্নাত নামায দুনিয়া থেকে এবং দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু রয়েছে, সবকিছু থেকে উত্তম। [সহীহ্ মুসলিম১/৫০১]



##প্রাসঙ্গিক আলোচনা:


বর্ণিত হাদীসদ্বয় ও আরো অসংখ্য হাদীস শরীফের বিশুদ্ধ বর্ণনা মতে সুন্নাত নামাযের ফজীলত প্রমাণিত। হাদীস সংশ্লিষ্ট আলোচনার আলোকে সুন্নাতের অর্থ, গুরুত্ব, তাৎপর্য কুরআন হাদীসের সুন্নাত শব্দের ব্যবহার, উপরন্তু হাদীসের আলোকে সুন্নাত নামাযের ফজীলত ও কিছু সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ শরয়ী মাসআলা বর্ণনা করার প্রয়াস পাবঃ


##সুন্নতের অর্থ ও তাৎপর্য


প্রখ্যাত অভিধানবেত্তা ইবনুল মানযুর বলেন-

اَلسُّنَّةُ وَمَا تَصَرَّفَ مِنْهَا وَالْاُصُلُ فِيْهِ الطَّرِيْقَةُ وَالسِّيَرَةُ

অর্থাৎ সুন্নাহ এবং তা থেকে নির্গত শব্দের অর্থ হলো, রীতি-পদ্ধতি, পথ নিয়ম জীবন চরিত। [লিসানুল আরব, ৬ষ্ঠ খন্ড, পৃ. ৩৯৯]


##কুরআন ও হাদীসে সুন্নাত শব্দের ব্যবহার:


পবিত্র কুরআনের বহু স্থানে সুন্নাত শব্দের উল্লেখ রয়েছে-

سُنَّةَ مَنْ قَدْ اَرْسَلْنَا قَبْلَكَ مِنْ رُسُوْلِنَا وَلاَتَجِدُ لِسُنَّتِنَا تحويلاَ

অর্থাৎ আমার রাসূলগণেল মধ্যে আপনার পূর্বে যাদেরকে পাঠিয়েছিলাম তাদের ক্ষেত্রেও ছিল এরূপ নিয়ম, আর আপনি আমার নিয়মে কোন পরিবর্তন পাবেন না। [সূরা আল ইসরা: আয়াত-৭৭] এভাবে পবিত্র কুরআনের ১১টি আয়াতে ১৪বার সুন্নত শব্দটি ব্যবহার হয়েছে। মহান আল্লাহ্ তা‘আলা আরো এরশাদ করেছেন-

سُنَّةَ اللّٰهِ فِی الَّذِیْنَ خَلَوْا مِنْ قَبْلُۚ – وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّةِ اللّٰهِ تَبْدِیْلًا- (۶۲)

অর্থাৎ পূর্বে যারা অতীত হয়ে গেছে, তাদের ব্যাপারে এটাই ছিলো আল্লাহর রীতি। আপনি কখনো আল্লাহর রীতিতে কোনো পরিবর্তন পাবেন না। [সূরা আল আহযাব: আয়াত-৬২]



## হাদীস শরীফের আলোকে সুন্নাতের বর্ণনা


দৈনিক পঞ্জেগানা ফরজ নামাযের পূর্বাপর আমরা সুন্নাত নামায আদায় করি, অসংখ্য হাদীস শরীফ দ্বারা সুন্নাত নামাযের গুরুত্ব ও ফজীলত প্রমাণিত। যেসব নামায নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবায়ে কেরাম আদায় করেছেন তা আমাদের জন্য সুন্নাত হিসেবে গণ্য।


##ফজর ও জোহরের সুন্নাত অত্যধিক গুরুত্ববহ:


হাদীস শরীফে এরশাদ হয়েছে-

عَنْ عَائِشَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهَا اَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ لاَيَدْعُ اَرْبَعَا قَبْلَ الظُّهْرِ وَرَكَعَتَيْنِ قَبْلَ الْغَدَاةِ – (رَوَاهُ الْبُخَارِىْ)

হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম জোহরের পূর্বে চার রাকা‘আত এবং ফজরের পূর্বের দুই রাকা‘আত, পরিত্যাগ করতেন না। [বোখারী শরীফ]



##শরয়ী মাসায়েল:


সকল সুন্নাতের মধ্যে ফজরের সুন্নাত সর্বাধিক ফজীলত পূর্ণ। এমনকি ইমামগণ এটাকে ওয়াজিব বলেছেন, বিশুদ্ধ মতানুসারে ফজরের সুন্নাতের পর জোহর নামাযের পূর্বের চার রাকাআত সুন্নতের মর্যাদা।

হাদীস শরীফে এ প্রসঙ্গে এরশাদ হয়েছে যে ব্যক্তি তা পরিত্যাগ করবে, সে নবীজির শাফাআত পাবে না। [রদ্দুল মোখতার, বাহারে শরীয়ত, ৪র্থ খন্ড, পৃ.-২৩] জোহর বা জুম্আর সুন্নাত পড়তে পারেনি, ফরজ পড়ে নেবে। ফরজের পর পূর্বের সুন্নাত পড়ে নেবে। উত্তম হলো পরের সুন্নাত আদায়ের পর পূর্বের সুন্নাত পড়ে নেয়া। [ফাতহুল কদীর, বাহারে শরীয়ত ৪র্থ খন্ড]


##ফজরের সুন্নাত কাযা হলে


ফজরের সুন্নাত কাযা হলে সূর্যোদয়ের পর পড়ে নেয়া উত্তম। (গুনিয়া), ফরজ নামাযের পর সূর্যোদয়ের পূর্বে পড়া সর্বসম্মতভাবে নিষিদ্ধ।

[রদ্দুল মোখতার, ফাত্ওয়া-এ রজভীয়্যাহ, খন্ড-৩, পৃ. ৪৬২, বাহারে শরীয়ত, ৪র্থ খন্ড, পৃ. ২৪]


##আসরের সুন্নত:


আসরের সুন্নাত শুরু করল এমতাবস্থায় জামাত শুরু হল, তখন দু’ রাকাআত সুন্নাত পড়ে সালাম ফিরিয়ে জামাতে শামিল হয়ে যাবে। এ সুন্নাত পুনরায় পড়ার প্রয়োজন নেই। [ফাতওয়া-এ রজভীয়্যাহ] আসরের নামাযের পর কোন প্রকার নফল নামায পড়া নিষেধ। [দুররুল মোখতার, আলমগীরি]


##সুন্নাতের প্রকারভেদ: সুন্নাত দু’ প্রকার:


১. সুন্নাতে মুআক্কাদাহ, ২. সুন্নাতে গায়রে মুআক্কাদাহ্

সুন্নাতে মুআক্কাদাহ্ হচ্ছে সেই নামায যা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম সর্বদা আদায় করেছেন, ওজর ব্যতীত কখনো ত্যাগ করেননি। যে সুন্নাতের ব্যাপারে শরীয়তের তাগিদ রয়েছে। বিনা ওজরে একবারও বর্জন করলে গুনাহ্গার হবে। কোন কোন ইমাম সুন্নাতে মুআক্কাদাহ্ বর্জনকারীকে পথভ্রষ্ট হিসেবে গণ্য করেছেন। বর্জনে অভ্যস্থ ব্যক্তি ফাসিক, শরয়ী বিধানে তার সাক্ষ্য পরিত্যাজ্য। [বাহারে শরীয়ত, ৪র্থ খন্ড]


##সুন্নাতে মুআক্কাদাহ্ নামাযের রাকাআত সংখ্যা:


১. ফজরের নামাযের পূর্বে দুই রাকাআত

২. জোহরের নামাযের পূর্বে চার রাকাআত, পরে দু’ রাকাআত।

৩. মাগরিবের ফরজের পর দুই রাকাআত

৪. এশার ফরজের পর দুই রাকাআত। মোট বার রাকআত। সুন্নাতে মুআক্কাদাহ্ বিধানগতভাবে ওয়াজিবের কাছাকাছি। [ফাতাওয়া-এ রজভীয়্যাহ্, খন্ড-৩, পৃ. ২৭৯] জুমাবারে দুই রাকাআত ফরজের পূর্বে চার রাকা‘আত, ফরজের পর প্রথম নিয়্যতে চার রাকাআত, দ্বিতীয় নিয়্যতে দু’ রাকাআত। মোট দশ রাকাআত, সুন্নাতে মুআক্কাদাহ্ আদায় করতে হবে।


##সুন্নাতে গায়রে মুআক্কাদাহ্:


নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর সাহাবায়ে কেরাম অধিকাংশ সময়ে যে নামায আদায় করেছেন, কোন কোন সময় ওজর না থাকা সত্ত্বেও আদায় করেনি। তা সুন্নাতে গায়রে মুআক্কাদাহ্ এর অন্তর্ভুক্ত। উক্ত নামায আদায়ে অসংখ্য সওয়াব রয়েছে। তবে আদায়ের ব্যাপারে কঠোরতা নেই। তিরস্কার বা শাস্তি নেই। সুন্নাতে গায়রে মুআক্কাদাহ্কে সুন্নাতে যায়েদাহ্ও বলা হয়। [দুররুল মোখতার]

আসর নামাযের পূর্বে চার রাকা‘আত এবং এশার নামাযের পূর্বে চার রাকা‘আত সুন্নাতে যায়েদাহ’র অন্তর্ভুক্ত। [বাহারে শরীয়ত]


##জুমআর আগে-পরে সুন্নাতের বর্ণনা:


জুমুআর সুন্নাত প্রসঙ্গে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে- হযরত আবু আবদুর রহমান আস্ সুলামী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু আমাদেরকে নির্দেশ দিতেন যে, যেন আমরা জুম্আর আগে চার রাকাআত এবং পরে চার রাকাআত সালাত আদায় করি। [ফিকহুস সুনানি ওয়াল আমার, ১ম খন্ড, পৃ. ৩০৩]

তাহাবী শরীফে হাদীস বর্ণিত হয়েছে-

عَنْ عَلِىْ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ مَنْ كَانَ مُصَلِيًّا بَعْدَ الْجُمُعَةِ فَلْيُصَلِّ سِتًا – (طحاوى)

অর্থাৎ- হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, যদি কেউ জুমুআর পর সালাত আদায় করে তবে সে যেন ছয় রাকাআত সালাত আদায় করে। [তাহাবী শরীফ]

মাসআলা

জুমুআর পূর্বে চার রাকাআত সুন্নাতে মুআক্কাদাহ্ পরে চার রাকাআত পড়বে অতঃপর দু’ রাকাআত পড়বে। যেন উভয় হাদীসের উপর আমল হয়ে যায়।

[গুনিয়া, বাহারে শরীয়ত, ৪র্থ খন্ড] আসরের ফরজের পূর্বে চার রাকাআত সুন্নাতে যায়েদাহ্ প্রসঙ্গে এরশাদ হয়েছে-

عَنْ اِبْنِ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَحِمَ اللهُ اِمْرًا صَلَّى قَبَلَ الْعَصْرِ اَرْبَعًا-) رواه الترمذى(

অর্থাৎ হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, আল্লাহ্ সেই ব্যক্তিকে রহমত করুন। যে ব্যক্তি আসরের পূর্বে চার রাকাআত সালাত আদায় করে। [তিরমিযী, ফিকহুস সুনানি ওয়াল আসার] আসরের চার রাকাআত সুন্নাতে যায়েদা সময় সুযোগের অভাবে চার রাকাতের স্থলে দু’ রাকাআত আদায় করারও অনুমতি রয়েছে।

হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে

عَنْ عَلِىْ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ اَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلذَمَ كَانَ يُصَلِّىْ قَبْلَ الْعَصْرِ رَكَعَتَيْنِ- (رواه ابو داود)

অর্থাৎ হযরত আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আসরের পূর্বে দু রাকাআত সালাত আদায় করেছেন। [আবু দাউদ]


##মাগরিবের সুন্নাত:


মাগরিবের ফরজের পর দু’ রাকাআত সুন্নাতে মুআক্কাদাহ্ প্রসঙ্গে এরশাদ হয়েছে-

عَنْ عَآئِشَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُصَلِّىْ الْمَغْرِبَ ثُمَّ يَرْجِعُ اِلى بَيْتِىْ فَيُصَلِّىْ رَكَعْتَيْنِ-

হযরত আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহা থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মাগরিবের ফরজ সালাত আদায় করতেন, এরপর তিনি আমার ঘরে ফিরে এসে দু’ রাকআত সালাত আদায় করতেন। [ইবনে মাজাহ্, ১ম খন্ড, হাদীস নং-১১৬৪]


মাগরিবের পর ছয় রাকাআত আওয়াবীন নামায

عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ اَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ صَلَّى بَعْدَ الْمَغْرِبِ سِتَّ رَكَعَاتٍ لَمْ يَتَكَلَّمُ بَيْنَهُنَّ بِسُوْءٍ عُدِلْنَ لَه بِعَبَادِةِ ثِنْتَىْ عَشْرَةَ سَنَةً- )رواه ابن ماجه(

হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, যে ব্যক্তি মাগরিবের পরে ছয় রাকাআত সালাত আদায় করবে এবং এর মাঝখানে কোন মন্দ কথা বলবেনা, তাকে বার বছর ইবাদতের সাওয়াব দেওয়া হবে। [ইবনে মাযাহ, ১ম খন্ড, হাদীস-১১৬৭] মাগরিবের নামাযের পর ছয় রাকাআত সালাতুল আওয়াবীন পড়া খুবই ফজীলতপূর্ণ। হাদীস শরীফে এসেছে, যে ব্যক্তি মাগরিবের পর ছয় রাকাআত নামায পড়বে তার গুনাহ্ ক্ষমা করে দেওয়া হবে। যদিও তা সমুদ্রের ফেনার সমপরিমাণ হয়। [তিরমিযী, মুমিন কি নামায, পৃ. ১২৬]


## সুন্নাত ও নফল নামায ঘরে পড়া উত্তম:


ফকীহগণের বর্ণনা মতে সুন্নাত ও নফল নামায মসজিদের চেয়ে ঘরে পড়া উত্তম। নবীজি একদল লোককে মসজিদে নফল নামায আদায় করতে দেখে এরশাদ করেন- عَلَيْكُمْ بِهذِه الصَّلواةِ فِى الْبُيُوْتِ – [رواه الترمذى والنساء] তোমরা ওসব নামায ঘরে আদায় করবে। [তিরমিযী ও নাসাঈ] কিন্তু তারাবীহ্ নামায তাহিয়্যাতুল মসজিদ এবং সফর হতে প্রত্যাবর্তন করে দু’ রাকাআত নফল নামায মসজিদে পড়া উত্তম। ইতিকাফ পালনকারী নফল নামায এবং সূর্যগ্রহণের নামায মসজিদে পড়বে। [বাহারে শরীয়ত ৪র্থ খন্ড] যদি ঘরে ব্যস্ততা ও একাগ্রতা কম হওয়ার আশঙ্কা হয় তখন মসজিদে পড়বে। [রদ্দুল মোহতার] তবে অনেক সময় নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম মসজিদেই সুন্নত ও নফল আদায় করতেন। তবে তারাবীহ্র ক্ষেত্রে জামাতের বিধান থাকার কারণে মসজিদে আদায় করা উত্তম। [বাহারে শরীয়ত, ৪র্থ খন্ড]


Friday, 24 September 2021

বিসমিল্লাহ শরীফের অগনিত ফজিলত ও বরকত:

 


 


## বিসমিল্লাহ্ শরীফের অগনিত ফযীলত ও বরকত!


عَنْ اَبِىْ هُرَيْرَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كُل ُّ اَمْرٍ ذِىْ بَالٍ لاَ يَبْدأَ فِيْهِ بِبِسْمِ اللهِ فَهُوَ اَبْتَرُ [رواه ابوداود والنسائى وابن ماجه ]

অনুবাদ: হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, প্রত্যেক ভাল কাজ যেটা বিসমিল্লাহ্ দ্বারা শুরু করা হয়না সেটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। [আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাযাহ্]

প্রাসঙ্গিক আলোচনা

উক্ত হাদীস শরীফে বিসমিল্লাহ্ শরীফের ফযীলত বর্ণিত হয়েছে, ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ এটি পবিত্র কুরআনের একটি পূর্ণ আয়াত। পবিত্র কুরআনের সূরা তাওবা ব্যতীত অন্যান্য সকল সূরা বিসমিল্লাহ্ দ্বারা আরম্ভ করতে হবে। কলেমা শরীফ, লাইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম) পাঠ করা যেভাবে উত্তম যিকর, তেমনি বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম পাঠ করাও আল্লাহর মাকবুল ও উত্তম যিকর।

[মনোয়ারুল বয়ান, খন্ড-৩, পৃ.-১৩২] প্রত্যেক ভাল ও বৈধ কাজ বিসমিল্লাহ্ শরীফ দ্বারা শুরু করা মুস্তাহাব কিন্তু অবৈধ নাজায়িয ও হারাম কাজ বিসমিল্লাহ্ শরীফ দ্বারা করা নিষেধ। মদপানের সময়, যিনা-ব্যভিচারের সময়, জুয়া খেলা, চুরি, ডাকাতি করার সময় বিসমিল্লাহ্ পাঠ করা কুফরী। [ফতোয়ায়ে আলমগীরি]


## খাবারের সময় বিসমিল্লাহ্ পাঠ করার বরকত:


প্রতিটি ভালো কাজে বিসমিল্লাহ্ পাঠে বরকত ও রহমত রয়েছে, বিসমিল্লাহ্ পাঠ ব্যতীত কাজ বরকত শূন্য হয়।

যে খাবারের শুরুতে বিসমিল্লাহ্ পড়া হয় এতে শয়তান অংশ নিতে পারে না। বিসমিল্লাহর বরকতে খাবারসমূহ নূর হয়ে পেটে প্রবেশ করে। বিসমিল্লাহ্ পাঠ ব্যতীত খাবার খাওয়ার পরও ক্ষুধা অবশিষ্ট থেকে যায়। [আনোয়ারুল বয়ান, ২য় খন্ড, পৃ. ১৩২] হাদীস শরীফে রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-

اِذَا اَكَلَ اَحَدَكُمْ نَنْسِىَ اَنْ يُذْكَرَ اللهَ عَلى طَعَامِه فَلْيَقُلْ بِسْمِ اللهِ فِىْ اَوَّلَهُ وَاخِرِه

অর্থ: তোমরা খাবারের শুরুতে বিসমিল্লাহ্ পড়া ভুলে গেলে স্মরণ হওয়া মাত্র পড়ে নিবে। বিসমিল্লাহ্ ফী আউয়ালিহি ওয়া আখিরিহি। [তিরমিযী শরীফ, খন্ড-২, পৃ.৭, ইবনে মাযাহ্, পৃ.২৩৫]


## বিসমিল্লাহ্ পড়ে সকলে মিলে খাবারের বরকত:


এক সাহাবী নবীজির দরবারে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্! খাবারের পরও আমার ক্ষিধা অবশিষ্ট থেকে যায়, পরিতৃপ্ত হই না, নবীজি এরশাদ করেন সম্ভবতঃ তুমি একা খেয়ে থাকো, সাহাবী জবাব দিলেন, জী, হ্যাঁ, আমি একা আহার করে থাকি, নূর নবীজি এরশাদ করলেন-

اِجْتَمِعُوْا عَلى طَعَامِكُمْ وَاذْكُرُوْا اِسْمَ اللهِ تَعَالى يُبَارِكُ لَكُمْ فِيْهِ

সকলে এক সাথে খাবার খাও, খাবারে বিসমিল্লাহ্ পাঠ করো, তোমাদের খাবারে বরকত হয়ে যাবে।

[সুনানে ইবনে মাযাহ্, পৃ. ২৩৬, কানযুল উম্মাল, খন্ড-১৫, পৃ. ১০৩] প্রত্যেক মুসলমান নিজ স্ত্রীর নিকট বিশেষ মুহূর্তে গমনের পূর্বে বিসমিল্লাহ্ শরীফ পাঠ করলে শয়তানের প্রভাব থেকে পবিত্র থাকবে। যে সন্তান জন্ম নেবে সেই নেককার ও পূণ্যবান হবে। [আবু দাউদ শরীফ, খন্ড-২, পৃ. ২৯৩] মাওয়াহিবে লুদুনীয়া শরীফে উল্লেখ আছে, হযরত আবূ হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা স্ত্রী সম্ভোগের সময় বিসমিল্লাহ্ শরীফ পড়ে নিলে গোসল না করা পর্যন্ত ফিরিস্তাগণ সওয়াব লিখতে থাকবেন। [আনোয়ারুল বয়ান, খন্ড-৩, পৃ. ১৩৪]


## বাহনে আরোহণের সময় বিসমিল্লাহ্ পড়া:


হযরত আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যখন তোমরা বাহনে আরোহন করবে, ‘বিসমিল্লাহ্ আলহামদুলিল্লাহ্’ পাঠ করবে, এতে প্রতি কদমে নেকী প্রাপ্ত হবে। [মাওয়াহিবে লুদুনীয়া] বাহনযোগে যাতায়ত ও ভ্রমণের সময় বিসমিল্লাহ্ শরীফ পাঠ করলে বিভিন্ন বিপদাপদ ও দুর্ঘটনা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়।


##হযরত নূহ্ আলায়হিস্ সালাম নৌযানে আরোহণের সময় বিসমিল্লাহ্ পাঠ:


বিসমিল্লাহ শরীফ পাঠ করা নবীদের সুন্নাত। হযরত নূহ আলায়হিস্ সালাম জাহাজে আরোহণের সময় দুআ পাঠ করেছিলেন, ‘বিসমিল্লাহি মাজরীহা ওয়া মুরসাহা ইন্না রাব্বী লাগাফুর রাহীম।’ বিসমিরøাহর বরকতে আল্লাহ্ তা‘আলা মহাপ্লাবন থেকে নৌযান রক্ষা করেছেন।

যে ব্যক্তি সামুদ্রিক জাহাজে আরোহণের সময় এ দুআ পাঠ করবে আল্লাহ্ তাকে সমুদ্রে ডুবে যাওয়া ও বিপদ থেকে বাঁচাবে।

[তাফসীরে নাঈমী, খন্ড-১ম, কৃত. হাকিমুল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী রহ.]


##বিষপানে প্রতিক্রিয়া হলোনা:


সাহাবায়ে কেরাম সত্যের মাপকাঠি, ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব ও সত্যতা প্রমাণের জন্য প্রিয় রসূলের সাহাবী হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর নিকট কোন এক ব্যক্তি শর্ত আরোপ করল, আপনি যদি এ বিষ পান করে সুস্থ থাকতে পারেন, আমি ইসলামের সত্যতা স্বীকার করে কলেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যাব। হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বিসমিল্লাহ্ শরীফ পড়ে লোকটির কথামতো বিষপান করার পরও কোন প্রতিক্রিয়া হলোনা, সম্পূর্ণরূপে সুস্থ ছিলেন। হযরত খালিদ ইবনে ওয়ালিদের এ কারামত দেখে লোকটি ইসলাম কবুল করলেন। [তাফসীর নাঈমী, খন্ড-১ম]


বাদশাহ্ হিরাক্লিয়াসের মাথা ব্যথা দূরীভূত হলো

পবিত্র কুরআন সকল রোগের মহৌষধ। আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ করেছেন-

وَ نُنَزِّلُ مِنَ الْقُرْاٰنِ مَا هُوَ شِفَآءٌ وَّ رَحْمَةٌ لِّلْمُؤْمِنِیْنَۙ-

অর্থ: এবং আমি ক্বোরআনের মধ্যে অবতীর্ণ করি ওই বস্তু যা ঈমানদারদের জন্য আরোগ্য ও রহমত। [সূরা বনী ই¯্রাঈল: আয়াত-৮২

ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত আমিরুল মুমেনীন ওমর ইবনে খাত্তাব রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর নিকট একদা রোম সা¤্রাজ্যের বাদশাহ্ হিরাক্লিয়াস পত্র লিখলেন, আমিরুল মু’মিনেীন, আমি প্রচন্ড মাথা ব্যথায় ভুগছি আপনি একটু আমার চিকিৎসা করুন, খলিফাতুল মুসলেমীন বাদশাহর কাছে একটি টুপি প্রেরণ করলেন, বাদশাহ্ যখন এ টুপি মাথায় পরিধান করতেন, মাথা ব্যথা চলে যেতো, মাথার টুপি যখন নামিয়ে ফেলতেন, পুনরায় মাথা ব্যথা শুরু হয়ে যেতো। বাদশাহ্ আশ্চর্য হলেন এ কি রহস্য? এক পর্যায়ে টুপি খুলে দেখলেন, টুপির ভেতরে এক টুকরো কাগজে পবিত্র কুরআনের আয়াত ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ লিখা ছিলো, বিসমিল্লাহি শরীফের বরকতে মাথা ব্যথা দূরীভূত হলো, সাহাবায়ে কেরামের কুরআনী চিকিৎসা ইসলামের এক বিস্ময়কর আধ্যাত্মিক শক্তির গৌরবোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। [তাফসীরে নাঈমী, খন্ড-১ম, কৃত. হাকিমূল উম্মত মুফতি আহমদ ইয়ার খান নঈমী রহ.]


## ইন্তেকালের পূর্বে এক ব্যক্তির ওসীয়ত:


ইন্তেকালের পূর্বে এক ব্যক্তি, অসীয়ত করে গেল, যখন আমার ইন্তেকাল হয়ে যাবে তখন আমার সীনা ও কপালের উপর ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ লিখে দিবে, এভাবে করা হলো, অতঃপর কোন ব্যক্তি ওই সৌভাগ্যবান ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখে তাঁর অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে, মৃত ব্যক্তি জবাব দিলেন যখন আমাকে কবরে রাখা হলো, ফিরিস্তার আগমন হলো, যখন কপালে ‘বিসমিল্লাহ্’ শরীফ লিখা দেখলেন, ফিরিস্তারা বললো, তুমি আযাব থেকে রক্ষা পেয়েছো। [দূররে মুখতার, জানাযা শীর্ষক অধ্যায়, খন্ড-৩, পৃ. ১৮৫]

ঘরের বাইরের দরজার উপর বিসমিল্লাহ্ শরীফ লিখা

হযরত ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী রহমাতুল্লাহি আলায়হি স্বীয় প্রণীত বিশ্ববিখ্যাত তাফসীরে কবীরীতে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি ঘরের বাইরের দরজার উপর ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ লিখে রাখবে, ওই ঘর ধ্বংস থেকে রক্ষা পাবে। অর্থাৎ ঐ ঘরে অকল্যাণ ও অনিষ্টতা আসবে না।

[তাফসীরে কবীরি, আনোয়ারুল বয়ান, খন্ড-৩, পৃ. ১৩৮]


## বিসমিল্লাহ্র বরকতে ওস্তাদ ও মাতা পিতার ক্ষমা:


হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, যখন শিক্ষক শিক্ষার্থীকে বলে পড়ো, ‘‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ তখন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও শিক্ষার্থীর পিতামাতার জন্য ক্ষমা লিপিবদ্ধ করা হয়। [দায়লামী, আনোয়ারুল বয়ান, খন্ড-৩, পৃ. ১৩৫]


## বিসমিল্লাহ’র ‘বা’ অক্ষরের রহস্য:


আলমে আরওয়াহ্ তথা আত্মার জগতে আল্লাহ্ তা‘আলা সৃষ্টি কুলের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, আমি কি তোমাদের প্রভু নই? প্রত্যেকে জবাব দিলো, ‘‘বালা’’ অর্থাৎ হ্যাঁ, মানুষের মুখ থেকে সর্বপ্রথম ‘বা’ অক্ষর বের হয়েছিলো, পরম করুণাময় আল্লাহ তা‘আলাও তাঁর বাণী বিসমিল্লাহ্’ ‘বা’ দিয়ে শুরু করেছেন, যেন কুরআনুল করীম তিলাওয়াতের শুরুতেই আল্লাহর সাথে কৃত বান্দার অঙ্গীকারের কথা স্মরণ হয়ে যায়। [তাফসীরে নাঈমী]


## হযরত সোলায়মান আলায়হিস্ সালাম কর্তৃক প্রেরিত চিঠিতে বিসমিল্লাহ্ শরীফ:


হযরত সোলায়মান আলায়হিস্ সালাম রাণী বিলকিসের নিকট লিখিত চিঠিতে প্রথমে লিখেছিলেন-

اِنَّهٗ مِنْ سُلَیْمٰنَ وَ اِنَّهٗ بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِیْمِۙ

অর্থাৎ বিসমিল্লাহ শরীফের বরকতে হযরত সোলায়মান আলায়হিস্ সালাম, হযরত বিলকিসের সাথে দাম্পত্য জীবনে আবদ্ধ হয়েছিলেন এবং সমগ্র ইয়ামেন সা¤্রাজ্যে হযরত সোলায়মান আলায়হিস্ সালাম’র নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। [তাফসীরে নঈমী, খন্ড-১ম]


##আল কুরআনের সংখ্যাতাত্মিক রহস্য:


‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ আয়াতে আরবি বর্ণমালার ১৯টি অক্ষর রয়েছে। গোটা কুরআনের সূরা সংখ্যা ১১৪টি। যা ১৯ দিয়ে বিভাজ্য (১৯ী ৬ = ১১৪)। কুরআনে ইসম শব্দটি এসেছে ১৩৩ বার (১৯ী ৭ = ১৩৩)। আল্লাহ্ শব্দটি এসেছে ৫৭ বার (১৯ী ৩= ৫৭) রাহীম শব্দটি এসেছে ১১৪ বার (১৯ী ৬= ১১৪)।

এ অলৌকিকত্ব আল কুরআনের এক বিস্ময়কর মুজিযা। [আল কুরআন- ও সাহেবে কুরআন, পৃ. ১১]


 আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদের প্রতিটি কাজে বিসমিল্লাহ্ শরীফের বরকত দান করুন।(আমিন)

بخاه ا لنبي أمين صلي الله عليه وسلم

Thursday, 23 September 2021

আলা হযরতের দৃষ্টিতে নারী শিক্ষার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:

 


 



## নারী শিক্ষা : ইমাম আ’লা হযরতের দৃষ্টিভঙ্গি:


## হিজরী চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ-এ মিল্লাত, সহস্রাধিক জ্ঞানগর্ভ গবেষণালব্ধ কিতাব ও না’ত রচয়িতা, আরব-আজম নির্বিশেষে বিশ্বের প্রায় অর্ধশতাধিক খ্যাতিমান বিশ্ববিদ্যালয়ে যাঁর জীবনী ও মূল্যবান কর্মের উপর অসংখ্য এম.ফিল, পিএইচ.ডি গবেষণা কর্ম অনুমোদিত। তাঁর অনন্য সাধারণ চিন্তাধারা থেকে ইসলাম ও শিক্ষা দর্শন প্রসঙ্গে উল্লেখ যোগ্য যে মতামতগুলো লক্ষ্যণীয় এর আলোকে বর্তমান সমাজে মুসলিম নারীদের শিক্ষা অর্জন ও ইসলামী ভাবধারার শিক্ষার সমন্বয় এতদুভয় সম্পর্কে নিমোক্ত আলোচনার সূত্রপাত করা হয়েছে।

আল্লাহপাক পবিত্র কুরআনে ইরশাদ করেন –

یَرْفَعِ اللّٰهُ الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا مِنْكُمْۙ-وَ الَّذِیْنَ اُوْتُوا الْعِلْمَ دَرَجٰتٍؕ-وَ اللّٰهُ بِمَا تَعْمَلُوْنَ خَبِیْرٌ(۱۱)

“আল্লাহ তোমাদের মধ্যে ঈমানদারদের ও তাদেরই, যাদেরকে জ্ঞান প্রদান করা হয়েছে, মর্যাদা সমুন্নত করবেন। এবং আল্লাহর নিকট তোমাদের কর্মসমূহের খবর আছে” [সুরা মুজাদালাহ ঃ আয়াত ১১, অনুবাদ কানযুল ঈমান] হাদীসে পাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ ফরমান- “যে ব্যক্তি জ্ঞানার্জনের পথে বের হল এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সে ঐ রাস্তাতে আছে সে যেন মূলত আল্লাহর রাস্তাতেই রয়েছে”। (আল- হাদীস)

আ’লা হযরতের শিক্ষা দর্শন

মুসলিমনের-নারী মাত্রই জ্ঞান অর্জন করা ফরজ। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ সাধনের পাশাপাশি বর্তমানে যুগের অববাহিকায় জ্ঞান অর্জন করার মাধ্যম ও পদ্ধতিসমূহ বিভিন্ন ধারায় প্রচলিত রয়েছে। ইমাম আহমদ রেযা রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র বিশাল কর্মময় জীবনের পরিধি পর্যালোচনা করলে ও যুগোপযোগী তাঁর অতুলনীয় সংস্কার কর্মগুলোর মর্ম যথাযথ অনুধাবন ও বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে শিক্ষাজগতের মান উন্নয়ন, ইসলামী কৃষ্টি ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে মার্জিত ও সুষ্ঠু শিক্ষা কাঠামো বিনির্মাণ এবং ইসলামী কল্যাণময় জীবনাদর্শ ও চেতনার ভিত্তিতে আলোকিত সমাজ ও জাতি গড়া নিতান্তই সহজ ব্যাপার।

আ’লা হযরতের শিক্ষাদর্শন ও নীতিমালার প্রতি দৃষ্টিপাত করলে লক্ষ্যণীয় যে, ইসলাম ধর্মের মর্ম অনুধাবন ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করাই মূলত শিক্ষা অর্জনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আর এক্ষেত্রে ইলম হাসিল করার জন্য নিয়্যতের পরিশুদ্ধতার মাধ্যমেই কর্মের সুফল অর্জন করা যায়। যে জ্ঞান ব্যক্তিকে মারিফাতে ইলাহী তথা আল্লাহর পরিচয় অর্জন ও রিসালাতের মর্যাদা ও শান-মান অনুধাবন করতে সহযোগিতা করবে এবং ভাল-মন্দের পার্থক্য নির্ধারণের স্বকীয় যোগ্যতা অর্জন সাপেক্ষে মানব জীবনকে হক্ব ও হালালের পথে, ইসলামী শরীয়তের অনুগত হিসেবে পরবর্তী জীবন যাপনের করণীয় সাব্যস্ত করার মত করে গড়ে তুলবে তা-ই হল উপযুক্ত শিক্ষা।

ইসলাম ও নারীর মর্যাদা

ইসলাম আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ জীবন বিধান। এ জগত সংসারের সার্বিক শৃঙ্খলা বদ্ধ পরিক্রমা যাতে সুন্দর সুচারুরূপে পরিচালিত হতে পারে তাই আল্লাহপাক আশরাফুল মাখলুকাত হিসেবে মানবজাতি সৃষ্টি করে নর ও নারীর মাঝে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব বন্টন করে দিয়েছেন। যুগে যুগে নারী জাতি পারিবারিক অবকাঠামো সুদৃঢ করতে ও সমাজ-সংসার-সন্তানদের লালন-পালন এবং সার্বিক দেখাশোনার মাধ্যমে পুরো জাতির ভিত্তিমূল গড়তে অনবদ্য ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। এছাড়াও সমাজে চলার পথে নারীরা আজ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গৌরবের সাথে নিজ নিজ পারদর্শিতায় জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে অবদান রাখছে। ইসলাম নারীদেরকে আইয়্যামে জাহেলিয়্যাতের অন্যায়, অত্যাচার ও লাঞ্ছনার শেকল থেকে মুক্ত করে সমাজে বিভক্তিহীন ভাবে বাঁচার অধিকার দিয়ে তাদের মর্যাদাকে অত্যন্ত সমুন্নত করেছে। ইসলামের প্রারম্ভিক সময়ে আরবে মাত্র সতের জন লোক পড়ালেখা জানতেন, এর মধ্যে পাঁচজনই ছিলেন নারী। ইসলামের প্রাথমিক যুগের বিদুষী নারীরা শিক্ষা ক্ষেত্রে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। মহিলা সাহাবীদের আবেদনের প্রেক্ষিতে রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম নির্দিষ্ট দিনানুসারে তাঁদের শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা করেছিলেন। এমনকি প্রতিনিধি পাঠিয়েও তিনি নারীদের শিক্ষা দিতেন। ফলস্বরূপ অনেক নারী পাণ্ডিত্যের উদয় হয়েছিল, যারা ইসলামের মহান শিক্ষা প্রচারে অংশ গ্রহণ করে ছিলেন।

তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন হজরত আয়েশা সিদ্দীকা, নবী দুলালী মা ফাতেমা যাহরা, সাফিয়া, উম্মে সালমা, ফাতিমা বিনতে কায়েস, সৈয়িদানা ফিসা, উম্মে দারদা, আয়শা বিনতে সাদ, জয়নাব বিনতে সালমা, উম্মে আতিয়া, শিমা, সাকিনা, উম্মে হাবিবা, উম্মে শরীক, উম্মে ইউসুফ রদ্বিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুন্না আজমা’ঈন প্রমুখ।

ইসলামী দর্শন ছাড়াও অন্যান্য বিষয়ে পারদর্শী ছিলেন তখনকার নারীরা, এমনকি চিকিৎসা বিজ্ঞানেও নারীদের অসামান্য অবদান ছিল। খলিফাদের শাসনকালেও নারীরা শিক্ষাদীক্ষা, সাহিত্য, কাব্যচর্চা ও সমাজসেবায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। উম্মুলমু’মিনীন তাঁদের কাছে আগত মহিলাদের ধর্মীয়, ব্যক্তিগত, পারিবারিক প্রভৃতি বিষয়ে নৈতিক শিক্ষা দান করতেন। পৃথিবীর অন্য কোন ধর্মই ইসলামের ন্যায় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে সমাজে নারীদের অধিকারকে বিশ্লেষিত ও পরিমার্জিত করেনি। তাই অন্য সকল অধিকারের পাশাপাশি উপযুক্ত ও উপকারী জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে নিজেকে শিক্ষিত ও কর্মঠ হিসেবে গড়ে তোলার অধিকারও ইসলাম নারীকে দিয়েছে। তবে সে ক্ষেত্রে নারীদের স্বভাবগত বৈশিষ্ট্য ও কল্যাণমুখীতার দিকে খেয়াল রাখতে গিয়ে ইসলামী শরীয়ত নারী শিক্ষার ক্ষেত্রে সবিশেষ কিছু বিধিমালা ও সতর্কতা অবলম্বন করেছে। আর একথা সর্বজন বিদিত যে, উক্ত ইসলামী বিধিনিষেধের আওতায় থেকে পড়ালেখা করে জগতব্যাপী মুসলিম নারীদের জীবন সুসংহত ও কার্যকরী গুণাবলী সম্পন্ন হয়েছে। অপরদিকে পাশ্চাত্য ও বিধর্মী সংস্কৃতির অবলোকনে যেসব অপাংক্তেয় পদ্ধতির অনুপ্রবেশ শিক্ষা ব্যবস্থায় ঘটেছে, দূরদৃষ্টি দিয়ে গভীরভাবে অনুসন্ধান করলে তার অসারতা ও অপকারিতা প্রমাণিত।

নারী শিক্ষার্জনে আ’লা হযরত’র অভিমত

ইমাম আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র প্রদর্শিত শিক্ষা ব্যবস্থাতে উপরোক্ত বর্ণনা অনুযায়ী নারী শিক্ষাও তদ্রুপ ভাবগাম্ভীর্য বহন করে। বর্তমানে একশ্রেণীর তথাকথিত নারীবাদী জনগোষ্ঠী আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলায়হি কে নারী শিক্ষাবিরোধী বলে সাব্যস্ত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। অথচ ইসলামী শরীয়তের সীমারেখার ভিতরে নারীদের জন্য তাঁদের স্বভাব-প্রকৃতি ও জীবন যাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞানের বিষয়াদি, চাহিদার আলোকে, উপকারী ও স্বতন্ত্র সিলেবাস প্রণয়ন করা উচিত বলে ইমাম আহমদ রেযা খান রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র মূল্যবান অভিব্যক্তি বিদ্যমান রয়েছে। ইসলাম সহশিক্ষাকে অনুমোদন দেয়না। নারীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থায় স্বতন্ত্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ পূর্বক সেখানে পর্দাসহকারে যে সকল জ্ঞান ও কর্মমুখী বাস্তব শিক্ষা অর্জন সম্ভব সে সব বিষয়ই ইসলামে অনুমোদন দেয়া হয়েছে।

আমাদের বর্তমান সমাজের মুসলিম নারীদের অবস্থান বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, শিক্ষার্জন যেন সুনির্দিষ্ট ক্লাস ভিত্তিক ঊর্ধগামিতার মাঝেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। কিন্তু ইমাম আহমদ রেযা রহমাতুল্লাহি আলায়হি নারী শিক্ষার ব্যাপারে এমন যুগান্তকারী সমাধানের পথ মুসলিম জাহানকে দেখিয়ে ছিলেন যার ন্যূনতম বা কিয়দাংশ যদি এখনও সমাজের কোন পর্যায়ে বাস্তবায়িত হতে পারে তাহলে মুসলিম নারী জাতি পাবে ইসলামী শিক্ষার আলোকে অনন্য একদিশা। শিক্ষার্থীদেরকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে এবং খোদার যমীনে খোদার মর্জি মোতাবেক জীবন পাথেয় ও আখেরাতের অর্জন যোগাড় করতে এক অনন্য পথ-পদ্ধতি এই শিক্ষা দর্শন।

দ্বীনী ও দুনিয়াবী ইলম অর্জন

ইমাম আহমদ রেযা রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষার অবলম্বন মূলত ইসলামী শরীয়তের মৌলিক চারটি উৎস তথা- ১. আল-কুরআন, ২. আল-হাদীস, ৩. ইজমা এবং ৪.কিয়াস। এ চারটির বাইরে সবধরণের ইলম অতিরিক্ত। তবে এক্ষেত্রে অন্যান্য পার্থিব জ্ঞানার্জন যদি এই নিয়তে করা হয় যে, তদ্বারা দ্বীন ধর্মের কল্যাণ সাধন করা হবে। তাহলে তা-ও ধর্মীয় জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত হবে অন্যথা নয়। এছাড়াও কল্যাণ অর্জন ও উপকার হাসিল করার দৃষ্টিকোণ থেকেই সলামীশিক্ষা ব্যবস্থার সহায়ক প্রাচীন কিংবা আধুনিক, বুদ্ধিবৃত্তিক বা তথ্য-উপাত্তের সমাহার, চিকিৎসা বিজ্ঞান-প্রকৌশল, প্রযুক্তিবিদ্যা, ভূগোল, অর্থনীতি, জ্যামিতি, হিসাব বিজ্ঞানসহ যেকোন বৈধ জ্ঞান অর্জন করতে কোন সমস্যা নেই। এমনকি ইংরেজী ভাষা শিক্ষা যা স্বয়ং আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলায়হি ঘৃণা করেছেন কিন্তু কোন জ্ঞানী মুসলমান যদি খ্রিষ্টবাদের অসারতা প্রমাণ করতে ও খ্রিষ্ট মতবাদ খণ্ডনের জন্য সেই ইংরেজী শিক্ষা অর্জন করে তাতে নিঃসন্দেহে সাওয়াবের অধিকারী হবে বলে তিনি মত ব্যক্ত করেছেন। তবে যেসব জ্ঞান ইহ-পরকালে কোন কাজে আসবেনা অথবা অযৌক্তিক ও সমালোচনা যোগ্য সেসব জ্ঞান অর্জন নিষিদ্ধ।

আ’লা হযরতের শিক্ষা নীতিতে মুসলিম নারীদের সংশ্লিষ্টতা

ইমাম আ’লা হযরতের রেখে যাওয়া দারুল উলূম মানযারুল ইসলামের অনন্য শিক্ষা ব্যবস্থার দৃষ্টান্ত ও শিক্ষাচিন্তা ধারার পর্যায়ক্রমিক বিশ্লেষণও মূলত নারী শিক্ষা সংশ্লিষ্টতার উজ্জ্বল একেকটি ধাপ হিসেবে পরিগণিত হতে পারে।

একজন মায়ের কোলই তাঁর শিশুসন্তানের প্রথম শিক্ষা গ্রহণের অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াস্থল

মা নিজেই যদি উপযুক্ত শিক্ষায় প্রশিক্ষিত না হন, তাহলে মুসলিম জাতির ভবিষ্যত কর্ণধার শিশুরা অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে পড়বে। ইমাম আহমদ রেযা রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র শিক্ষা দর্শন অনুযায়ী নরম কাঠ যেমন যেদিকে ফিরানো হয় সেদিকেই ঝুঁকে পড়ে, ঠিক তেমনিভাবে বাচ্চাদের প্রাথমিক শিক্ষাই তাদের পরবর্তী জীবনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধনে ভূমিকা রাখবে। এক্ষেত্রেও জীবনে মর্যাদা ও প্রশান্তি সৃষ্টির লক্ষ্যে শিশুর মনে মমত্ববোধ ও ভালবাসার মাধ্যমে যেগুণ গ্রাহীতা গড়ে তোলার প্রতি আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলায়হি অপরিসীম গুরুত্বারোপ করেছেন সেই মহান দায়িত্বের অধিকাংশই একজন মায়ের পালন করতে হয়। মাতৃভাষায় পাঠদান ও ভাষা শিক্ষার সময় তার মাঝে রুচিবোধ ও ইসলামী মন মানসিকতা জাগিয়ে তোলা এবং শারীরিকভাবে কর্মক্ষম ও ছোট ছোট পদক্ষেপে বোধশক্তির সুউজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে শিশুটিকে গড়ে তুলতে নানাবিধ প্রায়োগিক প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেয়া জানা থাকাটাও একজন মায়ের জন্য নেহায়েতই জরুরী। সন্তানের মুখে আধো আধো বুলি ফুটতেই প্রথমে ‘আল্লাহ আল্লাহ’ তারপর সম্পূর্ণ কলেমা তাইয়্যেবাহ শেখানো থেকে শুরু করে, বোধশক্তি হলে ইসলামী তাহযীব-তমদ্দুনের আদলে সন্তানকে শিষ্টাচারিতা আদব-আখলাক শিক্ষা দেয়া, খানা-পিনা, চলাফেরা, উঠা-বসা, নম্রতা, লজ্জাশীলতা, বড়দের সম্মান, পিতা-মাতা আত্নীয় স্বজন ও শিক্ষকদের প্রতি ভক্তি-শ্রদ্ধা পোষণ করা ইত্যাদি সহ কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষা দেয়া এবং ইসলামী আক্বীদা, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র সুন্নত সম্পর্কিত জ্ঞান শিক্ষা দেয়া, সাত বছর বয়সে নামাজের মৌখিক তাকীদ দেয়া, ইলমে দ্বীন বিশেষত অজু, গোসল, নামাজ, রোযা ইত্যাদির মাস’আলা শিক্ষা দেয়াসহ সৎসঙ্গ বজায় রেখে আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় হাবীব সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র সন্তুষ্টি অর্জনের খাতিরে নিজেকে পুরো জীবন নিবেদিতপ্রাণ রাখা প্রভৃতি ইমাম আহমদ রেযা রহমাতুল্লাহি আলায়হি কতৃক বর্ণিত সকল মহিমান্বিত ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিক্ষার সাথেই মায়ের তথা নারী শিক্ষা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একজন নারী নিজে ইসলামী শিক্ষায় সুশিক্ষিত না হলে তাঁর মাধ্যমে গড়ে ওঠা পরিবার ও স্বামী-সন্তানাদি কখনোই ইসলামের সুশীতল শিক্ষার পরম সে ছায়া পাবেনা। তা ছাড়া ইসলামের এমন অসংখ্য বিষয়াদি যেমন- উত্তরাধিকার আইন, মহরানা ইত্যাদি বহু এমন জ্ঞান রয়েছে যা নারীর জন্য অর্জন করা একান্ত অপরিহার্য, নয়ত সে একজন মুসলিম নারী হিসেবেও নিজের অধিকার ও অবস্থান সম্পর্কে সম্যক অবগত ও সচেতন হতে পারবেনা।

আমাদের সমাজের দিকে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, মুসলিম নারীরা বর্তমানে বৃটিশ কলোনী শাসনের রেখে যাওয়া সেই দুরভিসন্ধিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থারই সংযোজিত-বিয়োজিত ও কিছুটা পরিবর্তিত রূপে স্কুল-কলেজ বা মাদ্রাসা ইত্যাদিতে নিজেদের জ্ঞানার্জন প্রক্রিয়া চালিয়ে যাচ্ছে। সুনির্দিষ্ট শিক্ষা সনদ অর্জন শেষে জীবিকা অর্জনের তাগিদে অপারগতা থেকে অথবা অর্জিত শিক্ষাকে সমাজে কাজে লাগাতে গিয়েও নারীরা অনেকেই বিবিধ সেক্টরে কর্মক্ষেত্রেও নিয়োজিত হচ্ছেন। ইমাম আহমদ রেযা রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র শিক্ষাদর্শন বিবেচনায় বর্তমান প্রেক্ষাপটের দিকে লক্ষ্য করলে নারী সমাজের পরিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তন যোগ্য না হলেও অন্ততপক্ষে শিক্ষার্থীদের চারিত্রিক ও নৈতিক আদর্শগত উৎকর্ষতা বজায় রাখতে নারীদের ব্যাপকহারে পৃথক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সুনিশ্চিতকরণ ও পার্থিব শিক্ষার পাশাপাশি ইলমে দ্বীন অর্জন করার প্রতিও গুরুত্বারোপ আরও জোরদার করা একান্ত প্রয়োজন। যার জ্বলজ্যান্ত একটি উদাহরণ হল, “মাসলাকে আ’লা হযরত”র উপর ভিত্তি করে শাহেনশাহে সিরিকোট রহমাতুল্লাহি আলায়হি’৫৪ তে এশিয়া বিখ্যাত দ্বীনী শিক্ষার যে মারকায জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া আলিয়া প্রতিষ্ঠা করে ছিলেন তারই অপর মহিলা শাখা হিসেবে’৯৬ তে জামেয়া আহমদিয়া সুন্নিয়া মহিলা মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন পীরে বাংগাল হযরত সৈয়্যদ মুহাম্মদ সাবের শাহ্ ম.জি.আ., যা আসলে আওলাদে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র মাধ্যমে আমাদের বাংলাদেশেই আ’লা হযরতের উন্নয়নমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার সুন্দরতম নজির বহন করছে। পরিশেষে পদ্ধতিগুলোর উপযুক্ত বাস্তবায়ন সম্ভবপর হলে মুসলিম নারীদেরকে পাশ্চাত্য ও হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির করাল থাবায় জর্জরিত অবস্থায় আর দিকভ্রষ্ট হতে হবেনা বরং সুনির্দিষ্ট প্রায়োগিক ইসলামী শিক্ষার পরিবেশ ও সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জীবন গঠণ করে কর্মক্ষেত্র, পরিবারসহ সে নারী যে অঙ্গনেই বিচরণ করুক না কেন, পূর্ণপর্দা সহকারে যেকোন প্রতিকূল অবস্থাতেও সে ইসলামী স্বকীয়তার আড়ালে নিজের জীবনকে উম্মুল মু’মিনীন মুসলিম নারী আদর্শের সেই চেতনার আলোকে গড়ে তুলতে পারবে, সর্বোপরি অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জন প্রতিফলিত হবেই আ’লা হযরত রহমাতুল্লাহি আলায়হি’র নারী শিক্ষার প্রতি কাক্সিক্ষত সেই শিক্ষা দর্শন ও চিন্তাধারার, যা হল- মারিফাতে ইলাহী অর্জনের মাধ্যমে ইশক্বে মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তথা দরবারে রিসালতে নিজেকে বিলীন করে দেয়া, সুনিশ্চিতভাবে অঙ্কিত হবে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণময় এক অধ্যায়, ইনশাআল্লাহ।

তথ্যসূত্র-

১. কানযুল ঈমান খাযাইনুল ইরফান, বঙ্গানুবাদ, মাওলানা মুহাম্মদ আবদুল মান্নান।

২. আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা রহমাতুল্লাহি আলায়হি: জীবন ও অবদান, অধ্যক্ষ মুহাম্মদ বদিউল আলম রিজভি। ২য় সংস্করণ ২৪ সফর ১৪৪২ হিজরি

৩. মারিফে রেযা, করাচি, দারুল উলুম মানযারুল ইসলাম শতবার্ষিকী সংখ্যা, জুলাই-সেপ্ট ২০০১, পৃঃ ২০৮,২০৯

৪. ফতোওয়ায়ে রিজভীয়্যাহ, ১০ম খন্ড, ইমাম আ’লা হযরত (র.)

৫. মালফুযাত ই আ’লা হযরত, শাহজাদা মাওলানা মুস্তফা রেযা বেরলভী (র.), অনুবাদ- মুজিবুর রহমান নেজামী, প্রকাশ- ২০১৩

৬. আ’লা হযরত কি নযরিয়াতে তা’লীম কি সীধা সীধা খুসুসিয়াত, সলিম উল্লাহ জুন্দরান, রিসার্চ জার্নাল পাকিস্তান এডুকেশন ফাউন্ডেশন ইসলামাবাদ, জুলাই ১৯৯৯

৭. প্রফেসর ড.মুহাম্মদ মসউদ আহমদ, ইমাম আহমদ রেযা আউর আলমে ইসলাম, করাচী, ১৯৮৪ সন, পৃঃ ১১৮

৮. ইসলামে নারী শিক্ষা, ড. মোহাম্মদ বাহা উদ্দিন, প্রকাশ: ১৮ জানুয়ারি ১৯

৯. ইসলামে নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব, গাজী মো. রুম্মান ওয়াহেদ, ডেইলি-বাংলাদেশ.কম, প্রকাশ ২০১৯

১০. ইমাম আহমদ রেযা খা’র জীবন ও কর্ম, সৈয়্যদ মুহাম্মদ জালাল উদ্দিন, গবেষক, কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়।

১১. নারীশিক্ষায় ইসলামের প্রেরণা, মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান, প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৪

১২.ইমাম আহমদ রেযা খাঁন (র.)-এর প্রতি অপবাদের জবাব, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মাসউদ আহমদ, অনুবাদক- কাজী সাইফুদ্দীন হোসেন, প্রকাশ ২০১৮।


দরুদ শরীফ পাঠের অসাধারণ গুরুত্ব ও তাৎপর্য।

 


 

## নবী-ই আকরামের উপর দুরূদ শরীফ পাঠের ফযীলত অসাধারণ:


## আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট অত্যন্ত পছন্দনীয় কাজগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে তাঁর নবীর প্রশংসা করা। নবী-ই আকরামের উপর দুরূদ পাঠ করাও নবী-ই আক্রামের শান-মান চর্চার অপর নাম। তাই দুরূদ শরীফ পাঠের ফযীলতও অসীম-অসাধারণ।

প্রথমতঃ ক্বোরআন মজীদে আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমান-

اِنَّ اللّٰهَ وَ مَلٰٓىٕكَتَهٗ یُصَلُّوْنَ عَلَى النَّبِیِّؕ- یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا صَلُّوْا عَلَیْهِ وَ سَلِّمُوْا تَسْلِیْمًا(۵۶)

তরজমা: নিশ্চয় আল্লাহ্ ও তাঁর ফেরেশতাগণ দুরুদ প্রেরণ করেন ওই অদৃশ্য বক্তা (নবী)’র প্রতি, হে ঈমানদারগণ তোমরাও তাঁর প্রতি দুরূদ ও খুব সালাম প্রেরণ করো। [সূরা আহযাব: আয়াত-৫৬, কানযুল ঈমান]

এ আয়াত শরীফ থেকে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো প্রকাশ পায়ঃ

এক. দুরূদ শরীফ সমস্ত বিধানের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উত্তম কাজ। কেননা, আল্লাহ্ তা‘আলা কোন বিধানে নিজের ও নিজের ফেরেশতাদের কথা উল্লেখ করেননি- আমিও এ কাজ করছি, তোমরাও করো! একমাত্র দরূদ শরীফ ব্যতীত।

দুই. সমস্ত ফেরেশতা কোন নির্দিষ্টকরণ ছাড়াই, সর্বদা হুযূর-ই আক্রামের উপর দুরূদ শরীফ প্রেরণ করেন।

তিন. হুযূর-ই আক্রামের উপর আল্লাহর রহমতের অবতরণ আমাদের দো‘আ-প্রার্থনার উপর নির্ভরশীল নয়। যখন কিছুই সৃষ্টি হয়নি, তখনও মহান রব হুযুর-ই আক্রামের উপর রহমতের বারিধারা বর্ষণ করতে থাকেন। আমাদের দুরূদ শরীফ পাঠ করা মহান রবের দরবারে আমাদের ভিক্ষা-প্রার্থনার জন্যই। যেমন ফক্বীরগণ দাতার জান-মালের মঙ্গল কামনা করে ভিক্ষা চায়। আমরা হুযূর-ই আক্রামের মঙ্গল প্রার্থনা করে ভিক্ষা চাই।

চার. হুযূর-ই আক্রাম সর্বদা হায়াতুন্নবী; সবার দুরূদ ও সালাম শুনেন, জবাব দেন। কেননা, যে জবাব দিতে পারে না, তাকে সালাম করা নিষেধ; যেমন-নামাযী, ঘুমন্ত ব্যক্তি।

পাঁচ. সমস্ত মুসলমানের সর্বদা সর্বাবস্থায় দরূদ পাঠ করা চাই। কেননা, মহান রব ও ফেরেশতাগণ সর্বদা দুরূদ প্রেরণ করেন।

[তাফসীর-ই নুরুল ইরফান: এ আয়াত শরীফ] দ্বিতীয়তঃ হাদীস শরীফে খোদ্ রসূল-ই আক্রাম এরশাদ ফরমান-

এক. হযরত আবূ হোরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু থেকে বর্ণিত, রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওসাল্লাম এরশাদ করেছেন-

مَنْ صَلّٰى عَلَىَّ وَاحِدَةً صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ عَشْرًا

অর্থ: যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দুরূদ শরীফ প্রেরণ করে, আল্লাহ্ তা‘আলা আপন অনুগ্রহ ও বদান্যতায় তার উপর দশটি রহমত প্রেরণ করেন।

দুই. مَا مِنْ عَبْدٍ صَلّٰى عَلَىَّ اِلاَّ خَرَجَتِ الصَّلٰوةُ مِنْ فِيْهِ مُسْرِعَةً فَلاَ يَبْقٰى بَرٌّ وَلاَ بَحْرٌ وَلاَ شَرْقٌ وَلاَ غَرْبٌ اِلاَّ تَمُرُّبِه وَيَّقُوْلُ اَنَا صَلٰوةُ فُلاَنِ بْنِ فُلاَنٍ صَلّٰى عَلى مُحَمَّدٍ نِالْمُخْتَارِ مِنْ خَلْقِ اللهِ فَلاَ يَبْقى شَىْءٌ اِلاَّ صَلّٰى عَلَيْهِ

অর্থ: যে ব্যক্তি আমার উপর দুরূদ শরীফ প্রেরণ করে ওই দুরূদ শরীফ খুব শীঘ্রই তার মুখ থেকে বের হয়ে স্থলভাগ ও জলভাগ, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য অতিক্রম করে আর বলে, ‘‘আমি অমুকের পুত্র অমুকের দুরূদ শরীফ। সে হযরত মুহাম্মদ মোস্তফার উপর প্রেরণ করেছে।’’ সুতরাং একথা শুনতেই সমস্ত মাখলুক্ব তাঁর উপর রহমত বর্ষণের জন্য দো‘আ-প্রার্থনা করতে থাকে।

তিন. হাদীস শরীফে রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওসাল্লাম এরশাদ করেছেন-

اِنَّ اَوْلَى النَّاسِ بِىْ اَكْثَرُهُمْ عَلَىَّ صَلٰوةً

অর্থ: নিশ্চয় লোকজনের মধ্যে ওই ব্যক্তি আমার বেশী নিকটে, (নৈকট্য ও শাফা‘আত পাওয়ার বেশী উপযোগী), যে আমার উপর বেশী পরিমাণে দুরূদ শরীফ পাঠ করে।

চার. হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওসাল্লাম এরশাদ করেছেন-

اِنَّ الْجَنَّةَ تَشْتَاقُ اِلٰى خَمْسَةٍ نَفَرٍ : تَالِى الْقُرْاٰنِ وَحَافِظِ اللِّسَانِ وَمُطْعِمِ الْجِيْعَانِ وَمُكْسِىْ الْعُرْيَانِ وَمَنْ صَلّٰى عَلٰى حَبِيْبِ الرَّحْمَانِ

অর্থ: নিশ্চয় জান্নাত পাঁচ ব্যক্তির প্রতি উৎসুক: ক্বোরআন শরীফ তেলাওয়াতকারী, নিজের রসনাকে বাজে কথা থেকে রক্ষাকারী, ক্ষুধার্তকে আহারদাতা, উলঙ্গকে পোশাকদাতা এবং আল্লাহর মাহবুবের উপর দুরূদ শরীফ পাঠক।

পাঁচ. হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওসাল্লাম এরশাদ করেন-

مَنْ صَلّى عَلَىَّ عَشْرًا فِىْ اَوَّلِ النَّهَارِ وَعَشْرًا فِىْ اخِرِ النَّهَارِ نَالَتُهُ شَفَاعَتِىْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

অর্থ: যে ব্যক্তি আমার উপর সকালে দশবার দরূদ শরীফ পাঠ করে এবং বিকালে দশবার দরূদ শরীফ পাঠ করে ক্বিয়ামতের দিন সে আমার সুপারিশ পাবে। (সুতরাং যারা সকালে ও বিকালে ১০০ বার দরুদ শরীফ পাঠ করে তারা কত ভাগ্যবান। যেমন হযরত সিরিকোটি আলায়হির রাহমাহ্র ত্বরীক্বতের নিষ্ঠাবান মুরীদগণ)

ছয়. ইমাম আহমদ রহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি থেকে বর্ণিত, হযরত উবাই ইবনে কা’ব বলেছেন, আমি রসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওসাল্লাম-এর পবিত্র দরবারে আরয করলাম, ‘‘ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি আপনার উপর বেশী পরিমাণে দুরূদ শরীফ পাঠ করি। এখন আমার জানার বিষয় হচ্ছে, আমি আমার দো‘আ-দুরূদ পড়ার জন্য নির্দ্ধারিত সময়ের মধ্যে কি পরিমাণ সময় দুরূদ শরীফের জন্য নির্দিষ্ট করবো?’’ হুযূর-ই আক্রাম এরশাদ করলেন, ‘‘যে পরিমাণ চাও করে নাও! যদি বেশী পরিমাণ নির্দ্ধারণ করো তবে তা তোমার জন্য উত্তম হবে।’’ আমি আরয করলাম, ‘‘অর্দ্ধেক সময় নির্দ্ধারণ করছি!’’ হুযূর-ই আক্রাম এরশাদ ফরমালেন, ‘‘যে পরিমাণ চাও নির্দ্ধারণ করো, তবে তা থেকে বেশী করলে তোমার জন্য উত্তম হবে।’’ অতঃপর আমি আরয করলাম, ‘‘দুই তৃতীয়াংশ সময় নির্দ্ধারণ করলাম।’’ হুযূর-ই আক্রাম এরশাদ ফরমালেন, যে পরিমাণ চাও নির্দ্ধারণ করো! তবে এর চেয়েও বেশী সময় নির্দ্ধারণ করলে তোমার জন্য উত্তম হবে।’’ অতঃপর আমি আরয করলাম-جَعَلْتُ لَكَ اَوْقَاتِىْ كُلَّهَا

অর্থ: আমি আমার পুর্ণ সময়টুকু আপনার উপর দুরূদ শরীফ পড়ার জন্য নির্দ্ধারণ করলাম।’’

এর পর হুযূর-ই আক্রাম এরশাদ ফরমালেন- اِذًا يَكْفِىْ هَمَّكَ وَيُغْفَرُ لَكَ ذَنْبُكَ

অর্থ: এখন তোমায় সমস্ত দ্বীনী ও দুনিয়াবী গুরুত্বপূর্ণ কাজ পূর্ণ হবে এবং তোমার সমস্ত গুনাহ্ ক্ষমা হয়ে যাবে।

‘মিশকাত শরীফ: বাবুস্ সালাতি ‘আলান্ নবীয়্যি আলায়হিস্ সালাম’-এ হযরত ওমর রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন, ‘‘তোমাদের দো‘আগুলো আসমানগুলো ও যমীনের মধ্যখানে ঝুলন্ত থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা দুরূদ শরীফ পড়বে না। আর এমন হওয়া উচিৎ যে, আমাদের দো‘আগুলো থাকবে মধ্যখানে আর আশেপাশে থাকবে দুরূদ শরীফ। কেননা কবূল তো হয় দুরূদ শরীফ। আল্লাহর রহমতের জন্য এটা সম্ভব নয় যে, দুরূদ শরীফ কবূল করে নেবে এবং মধ্যভাগের দো‘আগুলো প্রত্যাখ্যান করবে। দুরূদ শরীফের মাধ্যমে দো‘আগুলোও ক্ববূল হয়ে যাবে।

মিশকাত শরীফের এ-ই অধ্যায়ে এও রয়েছে যে, আল্লাহর ফেরেশতাগণ ঘুরে বেড়ান আর দুরূদ শরীফ পাঠকদেরকে তালাশ করেন। যখন কেউ দুরূদ শরীফ পাঠ করে, তখন তার দুরূদ শরীফ আমার দরবারে পেশ করা হয়।

মসনভী শরীফে আছে- একবার নবী-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম মধু-মাছিকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুমি মধু কিভাবে তৈরী করো? সেটা আরয করলো, ‘‘ইয়া হাবীবাল্লাহ্! আমরা বাগানে গিয়ে সব ধরনের ফুলের রস চুষে নিই। তারপর ওই রস আমাদের মুখে নিয়ে আমাদের মৌচাকে এসে যাই। আর সেখানে বমি করে দিই। সেটাই মধু।’’ হুযূর-ই আক্রাম এরশাদ করলেন, ‘‘ফুলগুলোর রসতো তিক্ত হয়; কিন্তু মধু হয় মিষ্ট। বলতো মধুর মধ্যে এ মিষ্টতা কোত্থেকে আসে?’’ মধুমাছি জবাবে যা আরয করেছে তা মাওলানা রূম আলায়হির রাহমাহ্ কাব্যে এভাবে ব্যক্ত করেছেন-

‏گفت چوں خوانيم براحمد درود

مے شود شيرين وتلخى راربود

মৌমাছি বললো, ‘‘যখন আমরা হযরত আহমদ মুজতাবা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর উপর দুরূদ শরীফ পাঠ করি, তখন ওই রস থেকে তিক্ততা দূরীভূত হয়ে যায় এবং তদস্থলে মিষ্টতা এসে যায়। অর্থাৎ আল্লাহ্ সর্বশক্তিমান আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছেন, যেন আমরা বাগান থেকে আমাদের মৌচাক পর্যন্ত আপনার উপর দুরূদ শরীফ পড়তে পড়তে আসি। মধুর মধ্যে এ স্বাদ ও মিষ্টতা দুরূদ শরীফের বরকতেই আসে।

কিতাব ও সুন্নাহর দলীলাদি পেশ করার পর ফিক্বহের আলোকে দরূদ শরীফের বিধান উল্লেখ করার প্রয়াস পাচ্ছিঃ

দুরূদ শরীফ পাঠ করা ফরয, ওয়াজিবও, সুন্নাতও, মুস্তাহাবও, মাকরূহও, হারামও। এর তাফসীল বা বিস্তারিত বিবরণ এ যে, ‘দুররে মুখতার: প্রথম খন্ড: কিতাবুস্ সালাত’-এ আছে- গোটা জীবনে একবার দুরূদ শরীফ পাঠ করা ফরয। আর যেই মজলিসে বসবে আর হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নাম শরীফ সেখানে বারবার আসে, তখন ‘দুররে মুখতার’ প্রণেতার মতে, তুমি যখনই পবিত্র নামটি শুনবে তখন দুরূদ শরীফ পাঠ করা ওয়াজিব। আর (বারবার নাম মুবারক নেওয়া হলে) প্রত্যেকবার পড়া মুস্তাহাব।

কতিপয় স্থানে দুরূদ শরীফ পাঠ করা মুস্তাহাব। ওইগুলো ফতাওয়া-ই শামীতে আল্লামা শামী বর্ণনা করেছেন। ওইগুলো হচ্ছে জুমু‘আহর রাতে, জুমু‘আর দিনে, শনি, রবি ও সোমবারে, প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায়, মসজিদে আসা ও যাওয়ার সময়, হুযূর-ই আক্রামের রওযা শরীফের যিয়ারত করার সময়, সাফা ও মারওয়ার নিকটে, জুমু‘আহর খোৎবায়, কিন্তু খোৎবার শ্রোতাগণ দুরূদ শরীফ মনে মনে পড়বেন, আযানের পূর্বে ও পরে, প্রত্যেক দো‘আর শুরুতে ও শেষভাগে, ওযূ করার সময়, যখন কানে অদৃশ্য আওয়াজ আসতে থাকে, যখন কেউ কোন জিনিষের কথা ভুলে যায়, ওয়ায করার সময়; সবক পড়া ও পড়ানোর সময়; ফাতওয়া লেখার সময়, বিবাহ্ পড়ানোর সময় এবং কোন সমস্যা এসে গেলে ওই সময় ইত্যাদি।

সাত জায়গায় দুরূদ শরীফ পড়া মাকরূহ

১. স্ত্রী সঙ্গমের সময়, ২. প্র¯্রাব ও পায়খানা থেকে ফেরার সময়, ৩. ব্যবসার পণ্য-সামগ্রীকে প্রসিদ্ধ করার জন্য, ৪. পা ফসকে যাওয়ার সময়, ৫. আশ্চর্যবোধের সময়, ৬. পশু যবেহ করার সময় এবং ৭. হাঁচি আসার সময়।

তিনটি স্থানে দুরূদ শরীফ পড়া হারাম বা নিষিদ্ধ

১. যখন ব্যবসায়ী নিজের কোন পণ্যদ্রব্য ক্রেতাকে দেখাবে এবং সেটার উৎকৃষ্টতা বর্ণনা করার জন্য দুরূদ শরীফ পড়া। ২. যখন কোন মজলিসে কোন বড়লোক আসে, তখন তার আগমনের সংবাদ দেওয়ার জন্য দুরূদ পড়া, (শামী) এবং ৩. অনুরূপ, ফরয নামাযের ‘আত্তাহিয়্যাত’-এ যখন হুযূর-ই আক্রাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নাম আসবে; তখন দুরূদ শরীফ পড়া যাবে না।

উল্লেখ্য যে, ক্বোরআন-ই করীম তিলাওয়াত করার সময় হুযূর আলায়হিস্ সালাম-এর নাম আসলে, তখন দুরূদ শরীফ না পড়া উত্তম, যাতে ক্বোরআন পাঠের ধারাবাহিকতা ভঙ্গ না হয়। (শামী)

নামাযের শেষ বৈঠকে ‘আত্তাহিয়্যাত’-এর পর দুরূদ শরীফ পড়া সুন্নাত!

আরো উল্লেখ্য যে, ‘মিশকাত শরীফ: বাবুস্ সালাতি ‘আলান নবিয়্যি’-এর মধ্যে হযরত আবূ হুমায়দ সা‘ঈদী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর বর্ণনা রয়েছে। তিনি বলেন, আমরা হুযূর আলায়হিস্ সালামকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমরা আপনার উপর কীভাবে দুরূদ শরীফ পড়বো? তখন তিনি ওই দুরূদ শরীফের কথা বলেছেন, যা নামাযে ‘আত্তাহিয়্যাত’-এর পর পড়া হয়, অর্থাৎ দুরূদ-ই ইব্রাহীমী।

এ হাদীস শরীফের ভিত্তিতে যারা ‘দুরূদ-ই ইব্রাহীমী ব্যতীত অন্য কোন দরূদ শরীফ পড়া নিষিদ্ধ বলে, তারা জঘন্য ভুল করে। কারণ, ইমাম বোখারীসহ সমস্ত মুহাদ্দিস যখনই হুযূর-ই আক্রামের নাম মুবারক নিয়েছেন, তখন ‘সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’ বললেছেন ও লিখেছেন। দালাইলুল খায়রাত শরীফে অনেক দুরূদ শরীফ লিখা হয়েছে, ‘রূহুল বয়ান’ প্রণেতা মহোদয় এ দুরূদ শরীফের বহু ফযীলত ও উপকারিতা বর্ণনা করেছেন-

اَلصَّلواةُ وَالسَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ

اَلصَّلوةُ وَالسَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا حَبِيْبَ اللهِ

اَلصَّلوةُ وَالسَّلاَمُ عَلَيْكَ يَا خَلِيْلَ اللهِ

এটা খুব দীর্ঘ দরূদ শরীফ। হযরত আবদুর রহমান চৌহরভী আলায়হির রাহমাহ্ ত্রিশ পারা সম্বলিত বিরাটাকার দুরূদ শরীফ গ্রন্থ রচনা করেছেন। ইত্যাদি।

যুক্তির নিরীখেও দুরূদ শরীফ পাঠ করা অতি জরুরী কাজ। এর দু’টি কারণঃ

এক. যদি কেউ কারো উপর ইহসান করে, কারো উপকার করে, তবে উচিৎ হচ্ছে ইহসানকারীর ইহসানের বদলা দেওয়া। বদলা নিতে না পারলে কমপক্ষে তার জন্য দো‘আ করা চাই। যদি কারো ঘরে কেউ দাওয়াত খায়, তবে ঘরের মালিক ও সদস্যদের জন্য দো‘আ-ই খায়র করা উচিৎ।

উম্মতের উপর রসূল-ই আক্রামের ইহসানের সীমা নেই। আমরা তাঁর উপকারাদির বদলা দেওয়ার ক্ষমতা রাখিনা। তবে আমরা কমপক্ষে তাঁর উপর দুরূদ শরীফ পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর দরবারে সালাত ও সালাম (রহমত ও শান্তি) বর্ষণের দো‘আ-প্রার্থনা করতে পারি; যেমনিভাবে দরিদ্ররা দাতাদের জন্য দো‘আ করে থাকে।

দুই. দো‘আ করলে দুনিয়া মিলে, কিন্তু দুরূদ শরীফ পাঠ করলে দুনিয়া-¯্রষ্টার সবচেয়ে প্রিয়জন হুযূর-ই আক্রামকে পাওয়া যায়। তিনি মিললে কিছুর কমতি কিসের? দুরূদ শরীফ দো‘আ ও ইবাদতগুলোর রেজিষ্ট্রিই। যেভাবে বীমার লেবেল লেগে গেলে মাল-সামগ্রী হারিয়ে যায়না, কাক্সিক্ষত গন্তব্যে পৌঁছে যায়, তেমনি দুরূদ শরীফের বরকতে নেকীগুলো কবূল হয়। এ কারণে প্রত্যেক দো‘আয় দুরূদ শরীফ পাঠ করা হয়। কবি বলেন-

ميں مجرم هوں آقا مجھے ساتھ لے لو

كه رستے ميں هيں جابجا تاسنے والے

অর্থাৎ ওহে আমার মুনিব! আমাকে আপনার সাথে নিয়ে নিন! কারণ, আমি অপরাধী। আর রাস্তার মধ্যে প্রতিটি চেক পোষ্টে থানাদার (পুলিশ) অপরাধী ধরার জন্য বসে আছে।

সুতরাং আসুন, আমরা বেশী পরিমাণে আমাদের আক্বা ও মাওলার উপর দুরূদ শরীফ পাঠ করি।

.

Sunday, 19 September 2021

মাহে সফরের গুরুত্ব ফজিলত ও আমল সমূহ।

 


 



## মাহে সফরের গুরুত্ব ফজিলত ও আমল সমূহ।


মাহে সফর

‘সফর’ আরবী সনের দ্বিতীয় মাস। ইসলামের ইতিহাসে এ মাসটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যময়। মানব ইতিহাসের বহু ঘটনা বিশেষভাবে এ মাসে সংঘটিত হয়েছে হাদীস শরীফে এ মাস সম্পর্কে বহু বর্ণনা পাওয়া যায়।

এ মাসে অনেক সম্মানিত নবী নবুয়তের পরীক্ষামূলক মছিবতের সম্মুখিন হয়েছেন, যা ইতিহাসে খ্যাত। যেমন- হযরত আদম আলাইহিস্ সালাম’র জান্নাতে থাকাবস্থায় নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণ, হযরত ইব্রাহীম আলায়হিস্ সালামকে অগ্নিকুন্ডে নিক্ষেপ, হযরত আইয়ুব আলায়হিস্ সালাম’র কঠিন বালায় পতিত হওয়া, হযরত ইউনুচ আলায়হিস্ সালাম মাছের উদরস্থ হওয়া, মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর লোবাইদ ইবনে আছম ও তার পুত্রদের কৃত যাদুর বাহ্যিক প্রভাব থেকে আরোগ্য লাভের মত বহু ঘটনা ঘটেছে এ মাসেই।

বালা-মছিবত মুমিনের জন্য পরীক্ষা স্বরূপ। এ ধরণের বিপদে-আপদে ধৈর্য ধারণ ও আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করার জন্য হাদীস শরীফে শিক্ষা দেয়া হয়েছে। অলি বুযুর্গগণ বিভিন্ন ধরণের দু‘আ, নফল নামায, অজিফা ইত্যাদি দ্বারা সাধারণ মানুষকে ধন-স্বাস্থ্য ও সম্পদ এবং ঈমানী বালা-মছিবত থেকে রক্ষা করে খোদার নৈকট্য লাভের পথ দেখিয়েছেন।

এ মাসের নফল এবাদত

সফর মাসের চাঁদ উদিত হওয়ার পর দুই রাকাত করে ছয় রাকাত নফল নামায পড়া যায়। অতঃপর দরূদ শরীফ পাঠ করে নিম্নের দু‘আ পাঠ করবেন-

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা সল্লে আলা মুহাম্মাদিন আবদিকা ওয়া

নাবিয়্যিকা ওয়া আ’লা আলিহী ওয়া বারিক ওয়াসাল্লিম। আল্লাহুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিন র্শারি হাযাশ শাহ্রি ওয়া মিন কুল্লি সিদ্দাতিন ওয়া বালাইন ওয়া বালিয়্যাতিন কাদ্দারতা ফীহি এয়া দাহ্রু, এয়া দায়াহারু, এয়া দায়াহারু ওয়া ইয়া কানা এয়া কায়নুন, এয়া কায়নানু এয়া আজালু এয়া আবাদু এয়া মুবদিউ এয়া মুরীদু, এয়া যালজালালী ওয়াল ইকরামি এয়া যাল আরশিল মাজীদী আন্তা তাফয়ালু মা তুরীদু আল্লাহুম্মাহরুছ বি আইনিকা নফ্সী ওয়া আহ্লি ওয়া মালি ওয়া ওয়ালাদী ওয়া দ্বীনি ওয়া দুনয়াঈ মিন হাযিহিছ ছানাতি ওয়াকিনা মিন র্শারি মা ক্বাদাইতা ফীহা ওয়া কারিমনী ফিচ্ছফরে বি করমিন নজরে ওয়াখতিমহু লী বি ছালামাতিন ওয়া আদাতিন ওয়া আহ্লি ওয়া আউলিয়াই ওয়া কারাবায়ি ওয়া জামিয়ি উম্মাতি সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিন আলায়হিস্ সালামি এয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরামি ইবতালাইতানী বি ছিহ্হাতিহা বি হুরমাতিল আবরারি ওয়াল আখয়ায়ি ইয়া আজিজু ইয়া গাফ্ফারু ইয়া কারীমু ইয়া ছাত্তারু বি রহমাতিকা ইয়া আরহামার রাহিমীন।

সফর মাসের প্রত্যেক দিন উক্ত দু‘আ পাঠ করা যায়।

আখেরী চাহার সম্বাহ

সফর মাসের শেষ বুধবারকে আখেরি চাহার সম্বাহ বলে। এদিন অতি গুরুত্ব সহকারে পালন করা হয়। হুজূর সাইয়্যিদে আলম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম’র প্রতি ইহুদীগণ যাদু করেছিল এবং এর বাহ্যিক প্রভাব তাঁর দেহ মোবারকের বহির্ভাগে ক্রিয়াশীল হওয়ায় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অতঃপর হযরত জিব্রাঈল আলায়হিস্ সালাম আল্লাহর হুকুমে তাঁর হাবীবকে এ সম্পর্কে অবহিত করেন। অতঃপর প্রভাব নষ্ট করার পর হুজূর সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এ সফর মাসের শেষ বুধবার সুস্থতা বোধ করেন এবং গোসল করেন। নিম্নে বর্ণিত কার্যদ্বারা এ দিন উদ্যাপন করা অত্যন্ত উপকারী ও ফলদায়ক। সারা বৎসরের বালা-মছিবত, রোগ-শোক থেকে আল্লাহর কাছে পানাহ চাইতে এ আমল অত্যন্ত ফলপ্রদ বলে সূফী সাধক ও আলেমগণ মত প্রকাশ করেন।

আমল : এদিন সূর্যোদয়ের পূর্বে গোসল করা উত্তম। অতঃপর সুর্যোদয়ের পর দোহার নামাযান্তে দুই রাকাত নফল নামায পড়া যায়। প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহার পর এগারবার সূরা ইখলাস বা কুল হুয়াল্লাহু আহাদ, সালাম ফিরানোর পর সত্তরবার বা ততোধিক দরূদ শরীফ পাঠ করে নিম্নের দু‘আ তিনবার পাঠ করবেন-

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা র্ছারিফ আন্নী ছুআ হা-যাল ইয়াওমা ওয়া আছিমনী মিন ছূয়িহী ওয়ানাযযিনী আম্মা আছাবা ফীহি মিন নাহূছাতিহী ওয়া র্কুবাতিহী বিফাদ্বলিকা এয়া দাফিয়াশ র্শুরি ওয়া এয়া মালিকান নুশূরি এয়া আরহামার রাহিমীন; ওয়া ছাল্লাল্লাহু আলা মুহাম্মাদিন ওয়া আলিহিল আমজাদি ওয়া বারাকা ওয়াছাল্লাম।

এ দিন নিম্নের আয়াতে সালাম প্রত্যেক ফরজ নামাযের পর পাঠ করে সিনায় ফুঁক দিলে এবং কলা পাতায় বা কাগজে লিখে তা পানীয় জলে দিয়ে পান করলে আল্লাহর রহমতে বহু রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

আয়াতে সালাম

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ

سَلَامٌ عَلٰى نُوْحٍ فِى الْعَالَمِيْنড় اِنَّا كَذٰلِكَ نَجْزِى الْمُحْسِنِيْنَড় سَلَامٌ عَلٰى اِبْرَاهِيْمড় اِنَّا كَذٰلِكَ نَجْزِى الْمُحْسِنِيْنَড় سَلَامٌ عَلٰى مُوْسٰى وَ هَارُوْن اِنَّا كَذٰلِكَ نَجْزِى الْمُحْسِنِيْنَড় سَلَامٌ عَلٰى اِلْيَاسِيْنَড় اِنَّا كَذٰلِكَ نَجْزِى الْمُحْسِنِيْنَ ড়سَلَامٌ عَلَى الْمُرْسَلِيْنَড় سَلَامٌ عَلَيْكُمْ طِبْتُمْ فَادْخُلُوْهَا خَالِدِيْنَ سَلَامٌ هِىَ حَتَّى مَطْلَعِ الْفَجْرِ

এ দিন গোসল করার পর একটি পবিত্র ও পরিষ্কার পাত্রে পানি নিয়ে কলাপাতা বা কাগজে নি¤েœর দু‘আ ও নক্সা লিখে পাত্রের পানিতে ডুবিয়ে অতঃপর কোমর পর্যন্ত পানিতে দাঁড়িয়ে মাথার উপর পানি ঢালবেন। আল্লাহর ফজলে রোগ-ব্যাধি থেকে এর দ্বারা নিরাপদ থাকবেন।

দু‘আ ও নক্সা

بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ

اِنَّ اللهَ يُمْسِكُ السَّمَوَاتِ وَالْاَرْضِ اَنْ تَزُوْلَا وَلَئِنْ زَالَتَا اِنْ اَمْسَكَهُمَا مِنْ اَحَدٍ مِّنْ بَعْدِهِ اِنَّهُ كَانَ حَلِيْمًا غَفُوْرًا

۲ ۹ ۴

۷ ۵ ۳

۶ ۱ ۸

আখেরী চাহার সম্বাহ সম্পর্কে ফক্বীহগণের অভিমত

জাওয়াহেরুল কুন্জ ৫ম খণ্ডের ৬১৬ পৃষ্ঠায় উল্লেখ আছে সফর মাসের শেষ বুধবার সূর্যোদয়ের পূর্বে গোসল করা উত্তম। সূর্যোদয়ের পর দুই রাকাত নফল নামায পড়া ভাল।

নিয়ম : প্রথম রাকাতে ‘কুলিল্লাহুম্মা মালিকাল মুল্ক এবং দ্বিতীয় রাকাতে ‘কুল আদয়ুল্লাহা আদয়ুর রহমান’ থেকে সূরার শেষ পর্যন্ত পাঠ করবে। সালাম ফিরানোর পর নিম্নোক্ত দু‘আ পাঠ করবে-

আল্লা-হুম্মা র্সারিফ্ ‘আন্নী- সূ—আ হা-যাল ইয়াওমি ওয়া’সিম্নী- সূ—আহূ- ওয়া নাজ্জিনী- ‘আম্মা- আখা-ফূ ফী-হি মিন্ নুহূ-সা-তিহী- ওয়া কুরুবা-তিহী- বিফাদ্বলিকা ইয়া- দা-ফি‘আশ্ শুরু-রি ওয়া মা-লিকান্ নুশূ-রি ওয়া-আরহর্মা রা-হিমী-না ওয়া সাল্লাল্লা-হু-তা’আলা ‘আলা- সাইয়্যিদিনা- মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আ-লিহিল্ আমজা-দি ওয়া বা-রাকা ওয়া সাল্লাম। [রাহাতুল কূলুব ও জাওয়াহিরে গায়বী] অনুরূপভাবে ‘জাওয়াহেরে কান্জ, ৫ম খণ্ড, ৬১৭ পৃষ্ঠায় আছে, মাহে সফরের শেষ বুধবার ‘সপ্তসালাম’ লিখে তা পানিতে ধুয়ে পানিটুকু পান করবে। আবদুল হাই লক্ষ্নৌভী সাহেব তার মজমুয়ায়ে ফাতওয়ায়ও একথা উল্লেখ করেছেন। “তাযকিরাতুল আওরাদ” কিতাবে উল্লেখ আছে-

যে ব্যক্তি আখেরী চাহার সম্বার প্রত্যেক ওয়াক্ত নামাযের পর আয়াতে রহমত (সাত সালাম) পাঠ করে নিজের শরীরে ফুঁক দেয় বা তা পানের উপর লিখে ধুয়ে পান করে, আল্লাহ পাক তাকে সব রকম বালা মুসিবত ও রোগব্যাধি হতে নিরাপদ রাখবেন।

“আনওয়ারুল আউলিয়া” কিতাবে বর্ণিত আছে- যে ব্যক্তি আখেরী চাহার সম্বার দিন দুই রাকাত নফল নামায আদায় করবে আল্লাহ পাক তাকে হৃদয়ের প্রশস্ততা দান করবেন। প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পর এগার বার সূরা ইখলাস পাঠ করবে নামায শেষে ৭০ বার দরূদ শরীফ পড়বে (আল্লাহুম্মা সাল্লি আ‘লা সাইয়্যিদিনা মুহাম্মাদিনিন্ নাবিয়্যিল উম্মিয়্যি ওয়া আলা আলিহি ওয়া আসহাবিহী ওয়াসাল্লাম) অথবা প্রতি রাকাতে ৩ বার সূরা ইখলাস দ্বারা নামায শেষ করে ৮০ বার সূরা আলাম নাশরাহলাকা, সূরা নসর, সূরা ত্বীন ও ইখলাস পড়বে।

এ মাসে ওফাত প্রাপ্ত কয়েকজন বুযুর্গ

০৮ সফর: দাতা গঞ্জেবখশ্ লাহোরী (রাহ.) ওফাত।

১১ সফর: হযরত সালমান ফারসী (রাদ্বি.)।

২৬ সফর: মুজাদ্দিদ আল্ফসানী (রাহ.) ওফাত ১০৩৪ হিজরী।

২৫ সফর: ইমাম আহমদ রেযা খান বেরলভী (রাহ.)।

২৯ সফর: হযরত ইমাম হাসান (রাদ্বি.) শাহাদাত ৪৯ হিজরী।

আল্লাহ্ আমাদের বিপদ-আপদ থেকে পানাহ দিন; আ-মীন। বিহুরমাতি সাইয়্যিদিল আম্বিয়া সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম।

 

Thursday, 16 September 2021

পাক-নাপাকের মূলনীতি।

 পাক-নাপাকের ব্যাপারে মূলনীতি হল, যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে নাপাক হওয়ার বিষয়টি জানা না যাবে, ততক্ষণ পর্যন্ত শুধু সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কোনো জিনিসকে নাপাক বলা যায় না। (হিন্দিয়া: ১/৪৫)

সুতরাং আপনি নিশ্চয়তার উপর নির্ভর করবেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি বিছানা চাদরে নাপাকি লাগার ব্যপারে নিশ্চিত হবেন না ততক্ষণ পর্যন্ত কেবল সন্দেহের বশে বিছানা চাদরে নাপাকি লেগেছে বলা যাবে না। আর যদি নিশ্চিত হন, বিছানা চাদরে নাপাকি লেগেছে, তাহলে যতটুকুতে লেগেছে, ততটুকু ধুয়ে ফেলা জরুরি। পুরো চাদর ধোয়া জরুরি নয়।


অনুরূপভাবে যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি পেশাবের ব্যপারে নিশ্চিত হবেন না ততক্ষণ পর্যন্ত কেবল সন্দেহের বশে পেশাব গায়ে লেগেছে বলা যাবে না। আর যদি নিশ্চিত হন, পেশাব লেগেছে, তাহলে যতটুকুতে লেগেছে, ততটুকু ধুয়ে নিলেই যথেষ্ট হবে।




১. পেশাব করার সময় তাড়াহুড়ো করবেন না, বরং পেশাব বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন, অতঃপর পানি দ্বারা পেশাবের স্থান ধৌত করবেন। হাদীস শরিফে এসেছে,


عَنْ عِيسَى بْنِ يَزْدَادَ الْيَمَانِيِّ، عَنْ أَبِيهِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ إِذَا بَالَ أَحَدُكُمْ فَلْيَنْتُرْ ذَكَرَهُ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ


ঈসা ইবন ইয়াযদাদ আলইয়ামানী তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। রাসূল ﷺ ইরশাদ করেছেন, যখন তোমাদের কেউ পেশাব করে, তখন সে যেন তার লজ্জাস্থানকে তিনবার ঝেড়ে নেয় বা পবিত্র করে নেয়। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩২৬)


২. এরপরও যদি কোন কিছুর আশঙ্কা থাকে, তাহলে লজ্জাস্থানের আশপাশে লুঙ্গি বা পায়জামায় পানি ছিটিয়ে দিবেন। কারণ রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত, بَالَ ثم نَضحَ فَرْجَه তিনি পেশাব করেছেন, তারপর লজ্জাস্থানে পানি ছিটিয়ে দিয়েছেন। (আবু দাউদ: ১৬৭ )


৩. এরপর যতই সন্দেহ হোক সেদিকে মোটেই ভ্রুক্ষেপ করবেন না। আপনি নিশ্চয়তার উপর নির্ভর করবেন। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি পেশাবের ব্যপারে নিশ্চিত হবেন না ততক্ষণ পর্যন্ত কেবল সন্দেহের বশে পেশাব বের হয়েছে বলা যাবে না। হাদীস শরিফে এসেছে,


রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, হে আল্লাহর রাসূল, যদি কোন ব্যক্তি সন্দেহ করে যে, তার নামাযে কিছু বের হয়েছে। উত্তরে তিনি বলেন, لَا يَنْصَرِفْ حَتَّى يَسْمَعَ صَوْتًا أَوْ يَجِدَ رِيحًا নামায ছেড়ে দিবে না, যতক্ষণ না সে আওয়াজ শোনে, অথবা গন্ধ পায়। (বুখারী: ১৩৭)


এ হাদিস থেকে আমাদের বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ পেশ করার প্রক্রিয়া হচ্ছে–এখানে রাসূলুল্লাহ ﷺ নিশ্চয়তার উপর নির্ভর করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং সন্দেহের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে নামায ত্যাগ করা থেকে নিষেধ করেছেন। অনুরূপভাবে পবিত্রতার ক্ষেত্রেও অযু করার পর কোনো কিছু অনুভূত হলে, সে দিকে ভ্রুক্ষেপ করবেন না। বরং ততক্ষণ পর্যন্ত নিজেকে পবিত্রই মনে করবেন, যতক্ষণ পর্যন্ত স্বচোখে কোনো কিছু দেখবেন না অথবা পেশাবের ব্যপারে নিশ্চিত হবেন না। কারণ, কিছু বের না হওয়াটাই মূল।


মনে রাখবেন, এই সন্দেহ নিশ্চয়ই শয়তানের পক্ষ থেকে ওয়াসওয়াসা। কিছুদিন এভাবে করলে ওয়াসওয়াসা দূর হয়ে যাবে–ইনশাআল্লাহ।


والله اعلم بالصواب


Saturday, 11 September 2021

ইহুদী মেয়েদের সাতটি গুণ বা বৈশিষ্ট্য:

 ইহুদী মেয়েদের সাতটি গুণ বা বৈশিষ্ট্য:

দেড় হাজার বছর আগে রাসূলুল্লাহ (সা.) জানিয়েছেন ৭ টি গুণ বা বৈশিষ্ট্য ইহুদি মেয়েদের মধ্যে আছে আর এই সাতটি গুন যদি কোন মুসলিম মেয়েদের মধ্যে থাকে তবে তাদের হাশর হবে ঐ সকল ইহুদি মেয়েদের সাথে। সেই সাতটি গুণ বা বৈশিষ্ট্য হলো...
১. #আন্নানা- এর অর্থ হলো বেশি বেশি চাই জিনিসপত্র অনেক আছে তবুও তবুও অনেক চাই স্বামীকে বলে শুধু আমার জন্য দাও ।নিজের মা-বাবা ভাই-বোন এদের জন্য কোন কিছু দিও না,
২. #মান্নানা- এর অর্থ হল স্বামীকে শুধু সব সময় সকল ক্ষেত্রে খোটা দেয় অর্থাৎ খোটা দেওয়া এই স্বভাব ইহুদী মেয়েদের,

৩. #হান্নানা- হান্নান এর অর্থ হচ্ছে স্বামীর খেদমত না করা ,উল্টো আরো স্বামীকে দিয়ে খেদমত করিয়ে নেয়া। হযরত খাদিজাতুল কুবরা আল্লাহর নিকট থেকে সালাম পাওয়ার একমাত্র কারণ ছিল স্বামীর খেদমত করা।

৪.#কান্নানা- স্বামীকে মাঝে মাঝে বলে তুমি আমারে চেনো ? আমি অমুকের মেয়ে, তমুকের মেয়ে, চেয়ারম্যানের মেয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি ।স্বামীর সামনে নিজেকে বড় করে দেখানো, স্বামীকে ছোট মনে করা এটা ইহুদি মেয়েদের গুণ।
৫. #হাত্তকা্হ- হাত্তকাহ শব্দের অর্থ স্বামীর পছন্দের গুরুত্ব না দেওয়া । স্বামী যদি দুই টাকার জিনিস ও আপনাকে দেয় তবে তা আপনাকে আলহামদুলিল্লাহ ভালো গ্রহণ করতে হবে.। পরে মন ভালো হলে আরেকটা জিনিস আবদার করে নিয়ে নিবেন, স্বামীর মনে দুঃখ দেওয়া যাবে না।
৬. #শাত্তকা্হ- এর অর্থ হচ্ছে স্বামীকে হারাম ইনকাম করতে বাধ্য করা। স্বামীর হালাল ইনকামে আপনাকে সন্তুষ্ট থাকতে হবে। যদি আপনার কারণে আপনার স্বামী হারাম ইনকাম করে তাহলে স্বামীর সাথে আপনাকেও জাহান্নামে যেতে হবে।

৭.#বার্রকা্হ- এ অর্থ স্বামীকে মাঝে মাঝে ধরে মারা। অর্থাৎ স্বামীর গায়ে হাত তোলা এটা ইহুদি মেয়েদের স্বভাব।

#উপরোক্ত এই সাতটি গুন যেই মেয়েদের মধ্যে থাকবে তারা নামায, রোযা এবং পর্দা করলেও তাদের হাশর কিন্তু হবে ইহুদি মেয়েদের সাথে। আল্লাহ আমাদের মুসলিম মেয়েদের হাদীসটি আমল করার তৌফিক দান করুক।
আমিন....

Friday, 10 September 2021

গাইরে মাহরাম পুরুষের সাথে মেলামেশা হারাম।


গাইরে মাহরাম পুরুষের সাথে মেলামেশা হারাম



অনাত্মীয় গাইরে মাহরাম পুরুষের সাথে বসা নারীর জন্য হারাম। হযরত ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত-


 عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لاَ يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا مَعَ ذِي مَحْرَمٍ“


হযরত ইবনে আব্বাস (رضي الله عنه) রাসূলুল্লাহ (ﷺ) হতে বর্ণনা করেন, সাবধান কোনো পুরুষ যেন কোনো গায়ওে মাহরাম মেয়ের সাথে কোনো অবস্থায় নির্জন জায়গায় না বসে, শুধুমাত্র মাহরাম হলে তার জন্য পাশে বসা বৈধ।” ১৯৮


১৯৮.বুখারী, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৭৮৭


 


মেয়েদের জন্য গায়রে মাহরাম পুরুষের সাথে বসা নির্জন স্থানে হোক বা প্রকাশ্যে কোনো জায়গায় হোক, কোনো অবস্থায়ই জায়েয নেই। সাথে কোনো আত্মীয় থাকলেও গায়রে মাহরামের পাশে বসা মেয়েদের জন্য কোনো অবস্থায় বৈধ নয়। মনে রাখতে হবে যে, এই সহঅবস্থান দ্বারা শয়তান চোখ, কান, পা এবং অন্তরের যেনায় উভয়কে লিপ্ত করায়। যা এক সময় পরিপূর্ণ যেনায় মানুষকে লিপ্ত করায়। বর্তমান সময়ে শহরে মেয়েরা বিশেষ করে কম বয়স্ক মেয়েরা গাইরে মাহরামের সাথে উঠাবসা, চলাফেরা, কাজকর্ম করাকে মোটেই দোষনীয় মনে করে না। অথচ এগুলো কোনো অবস্থায়ই জায়েয নেই। লঞ্চ, ট্রেন, বিমান, বাস ভ্রমণেও এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার।



মনে রাখতে হবে যে, শরীয়তে নিষিদ্ধ কোনো কাজকে ফ্রি মাইন্ড বলে এড়িয়ে যাওয়া, পাত্তা না দেয়া কারো জন্যেই শুভ নয়। শরীয়তের নির্দেশিত পথই হচ্ছে সর্বোচ্চ শান্তি ও নিরাপত্তার পথ। অতএব, পার্কে, সমুদ্র সৈকতে, হোটেলে ও উদ্যানে কোনো অবস্থাতেই গাইরে মাহরাম পুরুষের সাথে বসা, গল্প করা কারো জন্যেই জায়েয নেই। একান্ত প্রয়োজন ছাড়া গাইরে মাহরাম পুরুষের সাথে কথা বলাও জায়েয নেই। অতএব, সবাইকে এ পথ থেকে বেঁচে থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে, জান্নাত বড় সুখের আর জাহান্নাম বড় নিকৃষ্ট ও কষ্টদায়ক স্থান।


Thursday, 9 September 2021

পর্দাহীনতা ও নির্লজ্জতার শান্তি।


পর্দাহীনতা ও নির্লজ্জতার শাস্তি


প্রশ্ন:- বেপর্দার শাস্তি কি?


উত্তর:- মহিলাদের বেপর্দা হওয়া আল্লাহ্ তাআলার গযবের মাধ্যম এবং ধ্বংসের কারণ। এই প্রশ্নের উত্তরে ১৮ পারার সূরা নূরের ৩১নং আয়াতের এই অংশটুকুর তাফসীর লক্ষ্য করুন। যেমনিভাবে আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন:



وَلَا يَضْرِبْنَ بِأَرْجُلِهِنَّ لِيُعْلَمَ مَا يُخْفِينَ مِن زِينَتِهِنَّ


.কানযুল ঈমান থেকে অনুবাদ: এবং যেন মাটির উপর সজোরে পদক্ষেপ না করে, যাতে জানা যায় গোপন সাজসজ্জা; (পারা: ১৮, সূরা: নুর, আয়াত: ৩১)


মন্দ মৃত্যুর কারণ।

 মন্দ মৃত্যুর চারটি কারণ:

মন্দ মৃত্যুর চারটি কারণ শরহুস সুদূর কিতাবে বর্ণিত রয়েছে: কতিপয় ওলামায়ে কিরাম ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ বলেন: মন্দ মৃত্যুর কারণ হলো চারটি: (১) নামাযে অলসতা, (২) মদ্যপান, (৩) মাতা-পিতার অবাধ্যতা, (৪) মুসলমানদেরকে কষ্ট দেয়া। (শরহুস সুদূর, ২৭ পৃষ্ঠা, দারুল কুতুবিল ইলমিয়া, বৈরুত) যে সব ইসলামী ভাই ﻣﻌﺎﺫﺍﻟﻠﻪ ﻋﺰﻭﺟﻞ (আল্লাহর পানাহ!) নামায আদায় করে না কিংবা কাযা করে আদায় করে, ফজরের (নামাযের) জন্য উঠে না অথবা শরীয়াত সম্মত অপারগতা ছাড়া মসজিদে জামাআ’ত সহকারে (নামায) আদায় করার পরিবর্তে ঘরেই নামায আদায় করে নেন, তাদের জন্য (এতে) চিন্তার বিষয় রয়েছে। নামাযে অলসতা যেন মন্দ মৃত্যুর কারণ না হয়। অনুরূপভাবে মদ্যপানকারী, মাতা-পিতার অবাধ্য ও মুসলমানদেরকে নিজের মুখ অথবা হাত ইত্যাদি দ্বারা কষ্ট প্রদানকারীরা সত্যিকারের তাওবা করে নিন।সদরুল আফাযিল আল্লামা মাওলানা সৈয়দ মুহাম্মদ নঈমুদ্দীন মুরাদাবাদী ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ বলেন: তাওবার মূল বিষয় হচ্ছে; আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা। এটার তিনটি ভিত্তি রয়েছে। এক, অপরাধ স্বীকার করা। দুই, অনুতপ্ত হওয়া। তিন, পরিত্যাগের ইচ্ছা (অথার্ৎ- এ গুনাহ্ ত্যাগ করার পাকাপোক্ত ইচ্ছা)। যদি গুনাহ্ ক্ষতিপূরণ উপযুক্ত হয় তবে সেটার ক্ষতিপূরণ দেয়াও আবশ্যক। যেমন- বেনামাযীর তাওবার জন্য পূর্ববর্তী নামায সমূহের কাযা আদায় করাও জরুরী। (খাযাইনুল ইরফান, ১২ পৃষ্ঠা, বোম্বাই) যদি বান্দার হক নষ্ট করে থাকে, তাহলে তাওবা করার সাথে সাথে সেগুলোর ক্ষতিপূরণ আবশ্যক। যেমন- মাতা-পিতা, ভাই-বোন, স্ত্রী অথবা বন্ধু কিংবা অন্যান্যদের মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে, তাহলে তার কাছ থেকে এভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করবে, যেন সে ক্ষমা করে দেয়। শুধুমাত্র মুচকি হেসে sorry বলে দেয়া প্রত্যেক বিষয়ে যথেষ্ট নয়!

 নফস ইয়ে কিয়া জুলুম হে হার ওয়াক্ত তাজা জুরম হে, নাতুয়া কে সর পে ইতনা বুঝ ভারী ওয়াহ ওয়াহ।

শিরকের সংজ্ঞা।

 শিরকের সংজ্ঞা।

 ❏ শিরকের সংজ্ঞা

____________________

❏ শিরকের সংজ্ঞা



শিরকের অর্থ হল আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কাউকে বা অন্য কিছুকে ‘ওয়াজিবুল উজুদ বা ইবাদতের যােগ্য বলে জানা। অর্থাৎ উলুহিয়াতে অন্যকে শরিক করা। আর এ হল কুফরের সব চাইতে নিকৃষ্টতর স্তর। এ ছাড়া আর যা যা রয়েছে, যতই জঘন্য কুফর হােক না কেন, শিরক অবশ্য নয়।


(বাহারে শরীয়ত, ১ম খন্ড, পৃষ্ঠা: ১৮৩)



আমার আকাআলা হযরত ইমামে আহলে সুন্নত মুজাদ্দিদে দীন ও মিলাত মাওলানা শাহ ইমাম আহমদ রযা খান (رحمة الله)বলছেন, কোন মানুষ মূলত: কোন অর্থেই মুশরিক হয় না, যে পর্যন্ত গাইরুল্লাহকে মাবুদ কিংবা স্বতন্ত্র সত্তা (অর্থাৎ স্বীয় সত্তায় অমুখাপেক্ষী, যথা এমন সব আকীদা পােষণ করা যে, তার এলম মৌলিক ও সত্তীয়) এবং ওয়াজিবুল উজুদ বলে মনে না করে।


(ফতাওয়ায়ে রজভীয়া। ২১তম খন্ড, পৃষ্ঠা: ১৩)



“শরহে আকাঈদে বর্ণিত আছে- শিরক আল্লাহ তাআলার উলুহিয়্যাতের মধ্যে কাউকে শরিক জানা। যেমন অগ্নি পুজারী আল্লাহ তাআলা ব্যতীত ওয়াজিবুল ওজুদ মানে অথবা আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কাউকে ইবাদতের যােগ্য জানা। যেমন: মূর্তিদের পূজারী।


(শরহে আকাঈদে নসফীয়া, পৃষ্ঠা নং-২০১)



হাশরের ময়দানে শাফায়াত বা সুপারিশ।

## হাশরের ময়দানে শাফায়াত বা সুপারিশ:



দেওবন্দী, ওহাবী, আহলে হাদিসদের আক্বিদা হল যে, কোন নবী-ওলী সুপারিশ করতে পারবে না। যারা নবী ওলীকে সুপারিশ কারী মনে করবে তারা আবু জাহেলের মতই মুশরিক। কেউ কাউকে রক্ষা করতে পারবে না। (তাকবীয়াতুল ঈমান, ৮ পৃষ্ঠা)


আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আক্বীদা হল, হুযুর পূর নূর (ﷺ) ময়দানে মাহশরে সুপারিশ করবেন। আল্লাহ তা‘য়ালার অনুমতিক্রমে হাশর মাঠে তিনি সুপারিশ করবেন।


মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:


مَنْ ذَا الَّذِي يَشْفَعُ عِنْدَهُ إِلَّا بِإِذْنِهِ يَعْلَمُ مَا بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَمَا خَلْفَهُمْ


-“আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ সুপারিশ করতে পারবে না। তার সামনে পেছনে সবকিছুই তিনি জানেন।




❏ ইমাম আলী ইবনে ওয়াহেদী (رحمة الله) এ আয়াতের তাফসিরে লিখেন-


مقامٍ محمودٍ وهو مقام الشَّفاعة يحمده فيه الخلق


-‘‘মাকামে মাহমুদ মানে শাফায়াত করার মর্যাদা লাভ, যেখান সমস্ত সৃষ্টি সৃষ্টি কর্তার প্রশংসা করবেন।’’ (তাফসিরে ওয়াহেদী, ১/৬৪৪ পৃ.)


মহান রব আরও ইরশাদ করেন-


عَسَى أَنْ يَبْعَثَكَ رَبُّكَ مَقَامًا مَحْمُودًا


-‘‘অচিরেই তিনি আপনাকে এমন স্থান দান করবেন, যেখানে সব কিছুই আপনার প্রশংসা করবে। ১৫তম পারা, ৯ রুকু, সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত নং-৭৯


## আক্বীদার সংজ্ঞা।

 



আক্বিদা বলতে কী বুঝায়?



আক্বিদা عقد শব্দ থেকে আগত। যার বাংলা শাব্দিক অর্থ: বন্ধন করা, গিরা দেওয়া, শক্ত হওয়া ইত্যাদি।


ভাষাবিদ ইবনে ফারিস (رحمة الله) এই শব্দের অর্থ বর্ণনা করে বলেন, “শব্দটির মূল অর্থই একটিই- দৃঢ় করণ, দৃঢ়ভাবে বন্ধন, ধারণ বা নির্ভর করা। শব্দটি যত অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে তা সবই এই অর্থ থেকে গৃহিত। (মু‘জামু মাকায়িসিল লুগাহ, ৪/৮৬পৃ.) তাই বুঝা যায় মানুষ কতিপয় বিশ্বাসকে অন্তরে ধারণকেই আক্বিদা বলে। এবার আমরা আক্বিদার পারিভাষিক সংজ্ঞা আলোকপাত করবো। আহমদ ইবনে মুহাম্মাদ আল-ফাউমী বলেন-


الْعَقِيْدَةُ مَا يَدِيْنُ الإِنْسَانُ بِهِ وَلَهُ عَقِيْدَةُ حَسَنَةً مِنَ الشَّكِ


-‘‘মানুষ ধর্ম হিসেবে যা গ্রহণ করে তাকে ‘আক্বিদা’ বলা হয়। যেমন-বলা হয়, তার ভাল আক্বিদা আছে অর্থাৎ তার সন্দেহ মুক্ত দৃঢ় বিশ্বাস আছে।’’ (আল-মিসবাহুল মুনীর, ২/৪২১পৃ.)


ড. ইবরাহিম আনীস বলেন-


(العَقِيْدَةُ) الحُكْمَ الَّذِي لَا يَقْبَلُ الشَّكَ فِيهِ لَدَىْ مُعْتَقِدِهِ وَ (فِي الدّين) مَا يُقْصَدُ بِهِ الِاعْتِقَاد دون الْعَمَل كعقيدة وجود الله وَبَعثه الرُّسُل (ج) عَقَائِدْ


-‘‘আক্বিদা অর্থ এমন বিধান বা নির্দেশ যা বিশ্বাসীর বিশ্বাস অনুসারে কোনরূপ সন্দেহের অবকাশ রাখে না....ধর্মীয় বিশ্বাস যা কর্ম থেকে পৃথক। যেমন আল্লাহ তা‘য়ালার অস্তিত্ব, রাসূলদের প্রেরণ। এটির বহুবচন আকায়েদ।’’ (আল-মুজাম আল-ওয়াসীত, ২/৬১৪পৃ.)


আল্লাহ পাকের অস্তিত্ব।

 আল্লাহতায়ালাই প্রকৃত অস্তিত্ব। 

তিনি ছাড়া বাকী যা কিছু আছে সে সমস্তকে আল্লাহ্পাকই অস্তিতে এনেছেন। সুতরাং,স্বয়ং অস্তিত্ব যিনি, তিনিই আল্লাহ্‌। তিনি খালেক (স্রষ্টা)। আর তিনি যাদেরকে অস্তিত্ব প্রদান করেছেন তারা মাখলুক (সৃষ্টি)।


আল্লাহ্পাকের জাত (সত্তা ও অস্তিত্ব) এক, অদ্বিতীয় । তার সিফাত (গুণাবলী) এক, অদ্বিতীয় এবং তার আফআ'ল (কার্যাবলী)ও এক, অদ্বিতীয় । তার অস্তিত্ব, গুণাবলী ও কাজ, সৃষ্টির অস্তিত্ব, গুণাবলী এবং কাজের মতো নয়। 

প্রকৃতপক্ষে কোনো বিষয়ে কেউ বা কোনো কিছু তার সঙ্গে সংযুক্ত নয়। অংশীও নয়। না অস্তিত্বে বিষয়ে । না গুণাবলী বা কাজের বিষয়ে ।


আল্লাহ্পাকের জাত প্রকারবিহীন (বেমেছাল)। তার সিফাতও বে-মেছাল।  তেমনি তার কার্যকলাপও বে-মেছাল। সৃষ্ট বন্তসমূহের জাত, গুণ ও কাজের সঙ্গে তার কোনোই সম্বন্ধ নেই।

Saturday, 4 September 2021

নবী করীম সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লামের সম্মানে ফাতেমা রাদিআল্লাহু আনহা দাঁড়িয়ে যেতেন।

হুযূর পুর নূর (ﷺ)’র সম্মানার্থে সায়িদ্যাতুননিসা ফাতেমা (رضي الله عنه)’র আমল:


ইমামুল মুহাদ্দেসীন ইমাম বুখারী (رحمة الله), ইমাম আবু দাউদ (রহ), ইমাম খতীব তিবরিযি (رحمة الله), সারকারে গাউসে পাক (رحمة الله), শায়খ আবদুল হক মুহাদ্দেসে দেহলভী (رحمة الله) এবং শাহ ওয়ালিউল্লাহ (رحمة الله) বর্ণনা করেন যে, হযরত উম্মুল মু‘মিনীন মা আয়েশা সিদ্দিকাহ (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে পাক (ﷺ) যখন মা ফাতেমা (رضي الله عنه)’র ঘরে তাশরীফ আসতেন। তখন তাঁর সম্মানার্থে দাঁড়িয়ে যেতেন। 


فَأَخَذَتْ بِيَدِهِ فَقَبَّلَتْهُ وَأَجْلَسَتْهُ فِي مجلسِها


-‘‘অতঃপর তাঁর হাত মুবারকে চুম্বন করে নিজের জায়গায় বসাতেন। আর হযরত ফাতেমা (رضي الله عنه) যখন রাসূল (ﷺ)’র দরবারে আসতেন, তখন রাসূল (ﷺ) দাঁড়িয়ে তাঁর হাতে চুমু দিতেন এবং নিজ স্থানে বসাতেন।’’ ২২২


২২২. ইমাম বুখারী, আদাবুল মুফরাদ, ১৩৮ পৃ., ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান, ৪/৩৩৫ পৃ. হা/৫২১৭, খতিব তিবরিযি, মিশকাত শরীফ, (ভারতীয় ছাপা ৪০২ পৃ.) ৩/১৩২৯ পৃ. হা/৪৬৮৯, শাহ ওয়ালী উল্লাহ দেহলভী, হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা ২য় খণ্ড ১৪৮ পৃ., শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দীসে দেহলভী, মাদারেজুন নবুওয়াত, (ফার্সী) ২য় খণ্ড ৫৪২ পৃ., শায়খ আব্দুল কাদের জিলানী, গুনিয়াতুত তালেবীন, ৩১ পৃ., ইমাম বায়হাকী, আস-সুনানুল কোবরা, ৭/১৬২ পৃ. হা/১৩৫৭৮ এবং আল-আদাব, ১/৯৭ পৃ. হা/২৪১ এবং শুয়াবুল ঈমান, ১১/২৭০ পৃ. হা/৮৫২৯

পিতা-মাতার মৃত্যুর পর সন্তানের কর্তব্য।

 পিতা-মাতার ওফাতের পরে সন্তানের কর্তব্য-



❏ নবম শতাব্দির মুজাদ্দিদ, হাফেযুল হাদিস, ইমাম জালালুদ্দীন সুয়ূতি (رحمة الله) সংকলন করেন-



وَأَخْرَج اِبْنِ النَجَّار فِي تَارِيْخه عَنْ أَبِي بَكْر الصِّديق قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اَللهِ صَلَّى اَلله عَلَيْهِ وَسَلَّم مَنْ زَارَ قَبْر وَالِديْهِ أَو أَحَدِهُمَا فِي كُلِّ جُمُعَة فَقَرَأَ عِنْدَهَا (يس) غَفَرَ اَلله لَهُ بِعَدَد كُل حَرْف مِنْهَا



-‘‘ইমাম ইবনে নাজ্জার (رحمة الله) তার ‘তারিখে মাদিনা’ গ্রন্থে হযরত আবু বকর সিদ্দিক (رضي الله عنه) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি প্রত্যেক জুম‘আর দিন তার পিতা-মাতার অথবা তাদের যে কোন একজনেরও কবর যিয়ারত করবে এবং তার কবরের নিকটে সূরা ইয়াসিন পাঠ করবে তাহলে তার প্রত্যেক হরফের পরিমান গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হবে।’’ ৯

{৯.ইমাম সুয়ূতি, তাফসিরে আদ-দুররুল মানসূর, ৭/৪০ পৃ., ইমাম আইনি, উমদাতুল ক্বারী, ৩/১১৮ পৃ.



আক্বিদা


এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হল যে জিবিত সন্তানরা মৃত পিতা-মাতার জন্য কোরআন তিলাওয়াত অথবা কোন নেক কাজ ঈসালে সাওয়াব হিসেবে পাঠালে পৌঁছে।



❏ এ প্রসঙ্গে আল্লামা মানাভী (رحمة الله) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন-



وَفِيه أَن الْمَيِّت تَنْفَعهُ الْقِرَاءَة عِنْده وَكَذَا الدُّعَاء وَالصَّدَقَة



-‘‘এ হাদিস থেকে বুঝা যায় যে, মায়্যিতের কবরের নিকট কিরাত পড়লে তার উপকার হয় এবং যেমনিভাবে দোয়া সাদকা করলে হয়।’’  ১০

{১০. আল্লামা মানাভী, তাইসির, ২/৪২০ পৃ.}



❏ বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার আল্লামা বদরুদ্দীন আইনি (رحمة الله) লিখেন-



فَذهب أَبُو حنيفَة وَأحمد، رَضِي الله تَعَالَى عَنْهُمَا، إِلَى وُصُول ثَوَاب قِرَاءَة الْقُرْآن إِلَى الْمَيِّت



-‘‘ইমাম আবু হানিফা (رضي الله عنه) এবং ইমাম আহমদ (رضي الله عنه) এ মত পোষণ করেছেন যে কোরআনের তিলাওয়াতের সাওয়াব মৃত্যু ব্যক্তির কাছে পৌঁছে।’’  ১১

{   ১১. আল্লামা আইনী, উমদাতুল ক্বারী, ৩/১১৮ পৃ.}



এ হাদিস থেকে ঈসালে সাওয়াব এবং নির্দিষ্ট দিনে কবর যিয়ারতের প্রমাণ পাওয়া গেল। ১২


{ ১২ . সম্পাদক কর্তৃক সংযোজিত।}

Friday, 3 September 2021

নবী করীম সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম নূরের তৈরী।

 নবী পাক (ﷺ) নূরের তৈরী

দেওবন্দীদের গুরুরা রাসূল (ﷺ) এর নূর মুবারককে অস্বীকার করে, কেবল বাশার বাশার করে চিৎকার করে।

আহলে সুন্নাত ওয়াত জামাতের আক্বীদা হল রাসূলে পাক (ﷺ) এর পবিত্র স্বত্ত্বা নূরানী ও বাশারীও সরকারে দু’আলম (ﷺ) এর জাত মুবারক বাশারিয়াতের পূর্বেও ছিল, কিন্তু দুনিয়ার মধ্যে বাশারী ছুরতে দৃপ্তি প্রকাশ করেছেন, পোশাক পরিবর্তনের কারণে হাকিক্বত পরিবর্তন হয় না।

যেমন হযরত জিবরাইল (عليه السلام) নূরের তৈরী, কিন্তু তিনি যখন হযরত মারিয়াম (عليه السلام)’র নিকট তাশরীফ আনতেন তখন মানব আকৃতিতে আসতেন। এর বর্ণনা মহান আল্লাহ তা’য়ালা উক্ত শব্দগুলোর মাধ্যমে করেছেন। যেমন-

فَتَمَثَّلَ لَهَا بَشَرًا سَوِيًّا

-“সুতরাং তিনি তাঁর সামনে একজন সুস্থ মানুষ রূপে প্রকাশ হলেন।” (পারা ১৬, রুকু ৫ সূরা মারিয়াম, আয়াত নং ১৭)

মিশকাত শরীফের প্রথম হাদিস যেটির বর্ণনাকারী দ্বিতীয় খলিফা হযরত সায়্যিদুনা উমর (رضي الله عنه), তিনি বলেন-

نَحْنُ عِنْدَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ ذَاتَ يَوْمٍ إِذْ طَلَعَ عَلَيْنَا رَجُلٌ

-“একদা আমরা রাসূলে কারিম (ﷺ) এর নিকট ছিলাম, আমাদের কাছে একজন মানুষ আসলেন।”

ইমামুল আম্বিয়া (ﷺ) হযরত ফারুকে আযম (رضي الله عنه) কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “এই লোকটি কে? ফারুকে আযম (رضي الله عنه) আরয করলেন, আল্লাহ তা‘য়ালা এবং তাঁর রাসূল (ﷺ) ই অধিক জানেন। সরওয়ারে (ﷺ) তখন ইরশাদ করেন,- فَإِنَّهُ جِبْرِيل -“তিনি হযরত জিবরাঈল (عليه السلام)।”

খতিব তিবরিযি, মিশকাতুল মাসাবীহ, পৃষ্ঠা ১১, হা/২, মুসনাদে আহমদ, ১/৪৩৪ পৃ. হা/৩৬৭, ইমাম নাসাঈ, আস-সুনান, ৮/৮৭ পৃ. হা/৪৯৯০, ইমাম আবু দাউদ, আস-সুনান, ৪/২২৩ পৃ. হা/৪৬৯৫, সহীহ মুসলিম, হা/৮

সম্মানিত পাঠকবৃন্দ! ‘রজুল’ বলা হয় এমন পুরুষকে যার চুল কালো, পোশাক সাদা, তার দুটি চোখ, দু’হাত, দু’পা এবং দুইটি কান রয়েছে।

সম্মানিত আলেমগণ অধিক অবগত যে, সম্মানিত মুহাদ্দিসীনে কেরাম হাদিস শরীফে এমন কোন হাদিস বর্ণনা করেছেন যেগুলোতে হযরত জিবরাঈল নবুওয়াতের দরবারে অনেকবার সাহাবী হযরত দাহিয়াতুল কালবী (رضي الله عنه)’র আকৃতিতে এসেছেন।

ইমাম তাবরানী (رحمة الله) তার মু‘জামুল আওসাত গ্রন্থে সংকলন করেন-

عَنْ أَنَسٍ، أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَقُولُ: يَأْتِينِي جِبْرِيلُ عَلَى صُورَةِ دِحْيَةَ الْكَلْبِيِّ

-‘‘হযরত আনাস ইবনে মালেক (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল (ﷺ) বলেছেন, নিশ্চয় জিবরাঈল (ﷺ) রাসূল (ﷺ) এর সাহাবী হযরত দাহিয়াতুল কালবী (رضي الله عنه)-এর আকৃতিতে আগমন করতেন।’’ (ইমাম তাবরানী, মু‘জামুল আওসাত, ১/৭ পৃ. হা/৭)

যেমন: দেওবন্দীদের নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিত্ব শায়খুল ইসলাম ও  ইবনে তাইমিয়া তার স্বীয় কিতাবে, ‘আল-ফুরকান বায়না আউলিয়ার রহমান ও আউলিয়াশ শায়তান’ এই বাস্তবতাটির সত্যতা নিন্মোক্ত শব্দের মধ্যে বলেছেন:

وَقَدْ أَخْبَرَ أن المَلَائِكَةَ جَاءَتْ إِبْرَاهِيْم عَلَيْهِ السَّلَام فِي صُوْرَةِ الْبَشَرِ، وَاِنَّ المَلِكَ تَمْثِلُ لِمَرْيَمَ بَشَراً سَوِيّاً، وَكَانَ جِبْرَيْل عَلَيْه الصَّلَاةُ وَالسَّلَام يَأتِي النَّبِيَّ صَلَّى اَللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي صُوْرَةِ دَحْيَةِ الْكَلْبِي وَفِي صُوْرَةِ أَعْرَابِي -مثل حديث تعليم الناس الإسلام والإيمان والإحسان- وَيَرَاهُمْ النَّاسُ كَذَلِكَ

-“নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘য়ালা এ সংবাদ দিয়েছেন যে, হযরত জিবরাঈল (عليه السلام) এর নিকট ফেরেশতা মানব আকৃতিতে আসতেন, হযরত মারিয়াম (عليه السلام)’র নিকট সুস্থ মানব আকৃতিতে এসেছেন। আর জিবরাঈল (عليه السلام) রাসূল (ﷺ) এর কাছে সাহাবী হযরত দাহিয়াতুল কালবী (رضي الله عنه) এবং বেদুইনের আকৃতিতে এসেছেন মানুষগণ তাদেরকে এভাবে দেখেছেন।’’

ইবনে তাইমিয়া, আল-ফুরকান বায়না আউলিয়ার রহমান ও আউলিয়াশ শায়তান, ৫/১৫ পৃ.

ইবনে তাইমিয়া কুরআন মাজীদে আল্লাহ তা‘য়ালা ফেরেশতাদের যেসব গুণাবলী বর্ণনা করেছেন, সেগুলো উল্লেখপূর্বক নিম্নোক্ত আয়াতগুলো লিখেছেন:

وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَنُ وَلَدًا سُبْحَانَهُ بَلْ عِبَادٌ مُكْرَمُونَ

-“তারা বললো, আল্লাহর সন্তান রয়েছে, আল্লাহ তা‘য়ালা এর থেকে পুত পবিত্র। যাদেরকে তারা সন্তান মনে করছে, তারা সন্তান নয়, বরং সম্মানিত বান্দা।” (সূরা আম্বিয়া, ২৬)

হযরত জিবরাঈল (عليه السلام) কে পবিত্র কুরআনে (بَشَرًا سَوِيًّا) সুস্থ মানুষ, (عبد) বান্দা বলা হয়েছে। হাদীসে পাকে (رَجُلٌ) বা পুরুষ বলা হয়েছে। হযরত দাহিয়াতুল কালবী (رضي الله عنه)’র আকৃতি ধারণ করার কথাও বলা হয়েছে, কিন্তু তিনি নূরেরই সৃষ্টি।

হযরত জিবরাঈল (عليه السلام)’র মানবীয় আকৃতি ধারণ এবং মানুষ রূপে প্রকাশ হওয়ার কারণে কী সাহাবায়ে কিরাম  (رضي الله عنه) তাঁর নূরানীয়তকে অস্বীকার করেছেন? না, কোথাও এরূপ দেখা যায় নি। কোন আকৃতিই জিবরাঈল (عليه السلام)’র নূরের সৃষ্টি হওয়াকে অস্বীকার করেন নি।

রাসূল (ﷺ) এর খাদেম, গোলাম এবং উম্মত জিবরাঈল (عليه السلام) যখন নূরের সৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও মানবীয় রূপ ধারণ করার ফলে তাঁর নূরের মধ্যে কোন ব্যবধান থাকেনা এবং কেউই তাঁর নূরকে অস্বীকার করেনা। তাহলে সেই জিবরাঈল নয় বরং সমস্ত সৃষ্টি জগতের সর্দার হুযূর পুর নূর (ﷺ) যদি মানবীয় রূপে এই ধরায় তাশরীফ আনেন তবে তাঁর মহান নূরানীয়তের মধ্যে কেনো ব্যবধান থাকবে? এমন কোন মুসলমান আছে যে, রাসূল (ﷺ) এর নূর মোবারককে অস্বীকার করবে?

এখন আপনাদের সামনে রাসূল (ﷺ) এর নূরের ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরাম  (رضي الله عنه)’র আক্বীদা পেশ করা হবে। রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেন,

أَوَّلُ مَا خَلَقَ اَللهُ نُوْرِي

-“আল্লাহ সর্বপ্রথম আমার নূর সৃষ্টি করেছেন।”


ইমাম কাস্তাল্লানী, আল-মাওয়াহিবুল্লাদুনিয়্যাহ, ১/১৮ পৃ., তাফসীরে আরাইসুল বায়ান, প্রথম খন্ড, ২৩৮ পৃষ্ঠা, তাফসীরে রুহুল বায়ান, প্রথ খণ্ড ৫৪৮ পৃষ্ঠা, জুরকানী, শারহুল মাওয়াহেব, প্রথম খণ্ড ৩৭ পৃষ্ঠা, শায়খ আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী, মাদারেজুন নবুয়ত, ফার্সী, দ্বিতীয় খণ্ড, ০২ পৃষ্ঠা, ইবনে জাওযী, বয়ানে মিলাদুন্নবী, ২৪ পৃষ্ঠা, মাহদী আল-ফার্সী, মাতালিউল মাসাররাত, ২৭ পৃষ্ঠা, এ হাদিসকে বর্তমানের বাতিলপন্থীগণ জাল বলে থাকেন, তাদের দাঁতভাঙা জবাব জানতে আমার লিখিত ‘প্রমাণিত হাদিসকে জাল বানানোর স্বরূপ উন্মোচন’ ১ম খণ্ডের ৫৬১-৫৮২ পৃষ্ঠা দেখুন, আশাকরি সঠিক বিষয়টি আপনাদের বুঝে আসবে।

❏ এ বিষয়ে একটি হাদিস ইমাম বায়হাকী (رحمة الله)সহ আরও অনেকে সংকলন করেন-

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَمَّا خَلَقَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ آدَمَ خَيَّرَ لِآدَمَ بَنِيهِ، فَجَعَلَ يَرَى فَضَائِلَ بَعْضِهِمْ عَلَى بَعْضٍ، قَالَ: فَرَآنِي نُورًا سَاطِعًا فِي أَسْفَلِهِمْ، فَقَالَ: يَا رَبِّ مَنْ هَذَا؟ قَالَ: هَذَا ابْنُكَ أَحْمَدُ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هُوَ الْأَوَّلُ وَالْآخَرُ وَهُوَ أَوَّلُ شَافِعٍ

-‘‘হযরত আবু হুরায়রা (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত। রাসূল (ﷺ) ইরশাদ করেন, যখন আল্লাহ্ তা‘য়ালা হযরত আদম (عليه السلام) কে সৃষ্টি করলেন, তখন তাকে তার সন্তান-সন্ততি দেখালেন। হযরত আদম (عليه السلام) তাদের পারস্পরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিরীক্ষা করতে থাকেন। অবশেষে তিনি একটি চমকদার নূর দেখতে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন : হে পরওয়ারদিগার! এ কার নূর? তিনি ইরশাদ করলেন, এ তোমার আওলাদ আহমদ (ﷺ)। তিনি (সৃষ্টিতে) প্রথম এবং প্রেরণের দিক থেকে (সকল নবীদের) শেষে, হাশরের ময়দানে তিনিই সর্বপ্রথম শাফায়াতকারী হবেন।’’

(ইমাম বায়হাকী, দালায়েলুল নবুয়ত, ৫/৪৮৩ পৃ. দারুল কুতুব ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, ইমাম সুয়ূতী : খাসায়েসুল কোবরা : ১/৭০ পৃ. হা/১৭৩, আল্লামা ইমাম ইবনে আসাকির : তারিখে দামেস্ক : ৭/৩৯৪-৩৯৫ পৃ. দারুল ফিকর ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন, ইমাম জুরকানী, শারহুল মাওয়াহেব, ১/৪৩ পৃ., দারুল ফিকর ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন, মুত্তাকী হিন্দী : কানযুল উম্মাল : ১১/৪৩৭ পৃ. হা/৩২০৫৬, আবূ সা‘দ খরকুশী নিশাপুরী, শরফুল মুস্তফা,  ৪/২৮৫ পৃ., ইমাম কাস্তাল্লানী, মাওয়াহেবে লাদুন্নীয়া,  ১/৪৯ পৃ., ইমাম দিয়ার বকরী, তারীখুল খামীস, ১/৪৫ পৃ., সার্রাজ,  হাদিসাহ,  হাদিস নং.২৬২৮, ইবনে হাজার আসকালানী,  আল-মুখালি­সিয়্যাত,  ৩/২০৭ পৃ.হা/২৩৪০, সালিম জার্রার,  আল-ইমা ইলা যাওয়াইদ,  ৬/৪৭৮ পৃ. হা/৬০৮৩, ইবনে সালেহ শামী,  সবলুল হুদা ওয়ার রাশাদ,  ১/৭১ পৃ., ইফরাকী, মুখতাসারে তারীখে দামেস্ক,  ২/১১১ পৃ.)

এ হাদিস থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হল স্বয়ং সৃষ্টিকর্তা মহান রব্বুল আ‘লামীন রাসূল (ﷺ)-এর কে সকল সৃষ্টির প্রথম বলে ঘোষণা দিয়েছেন, তারপরও যারা এর বিপরীতমুখি আক্বিদা অন্তরে ধারণ করেন তাদের আক্বিদা-ঈমান কতটুকু গ্রহণযোগ্য তার চিন্তার বিষয়, পাঠকবর্গ! যারা আল্লাহর বিপরীত কথা বলে সহজেই বুঝা যায় সৃষ্টিকর্তাকেও তারা ভয় করে না, যে আলেম দাবীদার অথচ আল্লাহকে ভয় করে না সে কি নিজেকে আলেম দাবী করতে পারে!

এ হাদিসটির সনদটি সহীহ তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

❏ এমনকি আহলে হাদিসদের তথাকথিত ইমাম নাসিরুদ্দীন আলবানী (১৯৯৯ খৃ.) এ সনদটি প্রসঙ্গে লিখেন-

قلت: وهذا إسناد حسن؛ رجاله كلهم ثقات رجال البخاري

-‘‘আমি (আলবানী) বলছি, এই হাদিসের সনদ ‘হাসান’, এর সকল বর্ণনাকারীগণ সহীহ বুখারীর বর্ণনাকারী ন্যায়।’’ (আলবানী, সিলসিলাতুল আহাদিসুদ্ দ্বঈফাহ, হা/৬৪৮২)

❏ ইমাম আবূ সা‘দ খরকুশী নিশাপুরী (ওফাত. ৪০৭ হি.)সহ অনেক মুহাদ্দিস ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক (رحمة الله)-এর কিতাব থেকে সংকলন করেন-

وروى عبد الله بن المبارك، عن سفيان الثوري، عن جعفر بن محمد الصادق، عن أبيه، عن جده، عن علي بن أبي طالب أنه قال: إن الله تبارك وتعالى خلق نور محمد صلى الله عليه وسلم قبل أن يخلق السماوات والأرض والعرش والكرسي والقلم والجنة

-‘‘বিখ্যাত হাদিসের ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক (رحمة الله) হতে বর্ণিত আছে, তিনি তাঁর শায়খ সুফিয়ান সাওড়ী (رحمة الله) হতে তিনি আলে রাসূল ইমাম জাফর বিন মুহাম্মদ সাদেক (رحمة الله) হতে বর্ণনা করেন, তিনি তাঁর পিতা ইমাম বাকের (رحمة الله) হতে বর্ণনা করেন, তিনি তাঁর পিতামহ হযরত জয়নুল আবেদীন (رضي الله عنه) হতে বর্ণনা করেন, তিনি আমিরুল মু‘মিনীন হযরত আলী (رضي الله عنه) হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, নিশ্চয় মহান রব তা‘য়ালা আসমান, যমীন, আরশ, কুরসী, কলম, জান্নাত সৃষ্টি করার পূর্বে রাসূল (ﷺ)-এর নূর মোবারককে সৃষ্টি করেছেন।’’

(ইমাম আবূ সা‘দ খরকুশী নিশাপুরী, শরফুল মোস্তফা, ১/৩০৮ পৃ., দারুল বাশায়েরুল ইসলামিয়্যাহ, মক্কা, সৌদি আরব, প্রথম প্রকাশ. ১৪২৪ হি.)

এ হাদিসের আলোকে বুঝা যায় যে, মহান রব সব কিছু সৃষ্টির পূর্বে তাঁর হাবিবের নূর মোবারককে সৃষ্টি করেছেন।

❏ বিশ্বের অন্যতম মুহাদ্দিস, হাফেযুল হাদিস, বিখ্যাত হানাফী ফকীহ, আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী (رحمة الله) তাঁর সুবিখ্যাত গ্রন্থ ‘মিরকাত’ এ উলে­খ করেন,

قَالَ ابْنُ حَجَرٍ: اخْتَلَفَتِ الرِّوَايَاتُ فِي أَوَّلِ الْمَخْلُوقَاتِ، وَحَاصِلُهَا كَمَا بَيَّنْتُهَا فِي شَرْحِ شَمَائِلِ التِّرْمِذِيِّ أَنَّ أَوَّلَهَا النُّورُ الَّذِي خُلِقَ مِنْهُ - عَلَيْهِ الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ- -، ثُمَّ الْمَاءُ، ثُمَّ الْعَرْشُ

-‘‘ইমাম ইবনে হাজার (رحمة الله) বলেন, আদি সৃষ্টি কোন বস্তু তা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা রয়েছে, যার সার-সংক্ষেপ আমি শামায়েলে তিরমিযীর ব্যাখ্যা গ্রন্থে আলোচনা করেছি। সর্বপ্রথম সেই নূরকে মহান রব সৃষ্টি করেছেন যে নূর থেকে রাসূল (ﷺ) কে সৃষ্টি করা হয়েছে, তারপর পানি সৃষ্টি করা হয়েছে, তারপর আরশ সৃষ্টি করা হয়েছে (তারপর কলম)।’’ (আল্লামা মোল্লা আলী ক্বারী : মিরকাতুল মাফাতীহ : ১/১৪৮ পৃ. হা/৭৯)

━━━━━━━━━━━o━━━━━━━━━

রাসূলে কারিম (ﷺ) এর জালিলুল কদর সাহাবী হযরত জাবের (رضي الله عنه) রাসূল (ﷺ) এর নিকট আরজ করলেন,

يَا رَسُولَ اللَّهِ بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي أَخْبِرْنِي عَنْ أَوَلَّ شَيْءٍ خَلَقَهُ اللَّهُ قَبْلَ الأَشْيَاءِ

-“হে রাসূল (ﷺ) ! আপনার কদমে আমার পিতা-মাতা উৎসর্গ হোক, আল্লাহ তা‘য়ালা সর্বপ্রথম কোন বস্তু সৃষ্টি করেন?” উত্তরে রাসূল (ﷺ) বললেন,

يَا جَابِرُ! إِنَّ اللَّهَ خَلَقَ قَبْلَ الأَشْيَاءِ نُورُ نَبِيِّكَ مِنْ نُورِهِ

-‘‘হে জাবের! আল্লাহ সর্বপ্রথম তাঁর নূর মোবারক থেকে তোমার নবীর নূর সৃষ্টি করেছেন।” 

ইমাম আব্দুর রায্যাক, আল-মুসান্নাফ, (জুযউল মাফকুদ) ৬৩ পৃ. হা/১৮, মাওয়াহিবুল ল্লাদুনীয়া শরীফ, প্রথম খণ্ড, ০৯ পৃষ্ঠা, যুরকানী, শারহুল মাওয়াহেব, প্রথম খণ্ড, ৪৬ পৃষ্ঠা, হালাবী, সিরাতে হালবীয়াহ, প্রথম খণ্ড, ৩৭ পৃষ্ঠা, আল্লামা মাহদী আল-ফার্সী, মাতালিউল মাসার্রাত শরহে দালাইলুল খায়রাত, ২১০ পৃষ্ঠা, শায়খ ইউসুফ নাবহানী, হুজ্জাতুল্লাহ আলাল আলামীন, ২৮০ পৃষ্ঠা এবং আনওয়ারুল মুহাম্মদীয়্যাহ, পৃষ্ঠা ০৯, আকীদাতুশ শোহদা, ১০০ পৃষ্ঠা, ফাতওয়ায়ে হাদিসিয়্যাহ, ৫১ পৃষ্ঠা, এ হাদিসকে বর্তমানের বাতিলপন্থীগণ জাল বলে থাকেন, তাদের দাঁতভাঙা জবাব জানতে আমার লিখিত ‘প্রমাণিত হাদিসকে জাল বানানোর স্বরূপ উন্মোচন’ ১ম খণ্ডের ৫৮৯-৬১০ পৃষ্ঠা দেখুন, আশাকরি সঠিক বিষয়টি আপনাদের বুঝে আসবে।

বোখারী শরীফের ব্যাখ্যাকার ইমাম আহমদ কাস্তাল্লানী (কুদ্দাসা সিররুহুল বারী) তাঁর স্বীয় কিতাব “মাওয়াহিবুল ল্লাদুনীয়্যায়  ➥23 একটি বর্ণনা নকল করেছেন যে, হযরত সায়্যিদুনা ইমাম জয়নুল আবেদীন (رضي الله عنه) হতে বর্ণিত, তিনি তাঁর সম্মানিত পিতা ইমামে শহীদে কারবালা হযরত ইমাম হোসাইন (رضي الله عنه) হতে এবং তিনি তাঁর পিতা শেরে খোদা মুশকিল কোশা হযরত সায়্যিদুনা আলী মরতুযা (رضي الله عنه) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূল কারিম (ﷺ) ইরশাদ করেন,

عن علي بن الحسين عن أبيه عن جده أن النبي ﷺ قال كنت نورا بين يدي ربي قبل خلق آدم بأربعة عشر ألف عام

-“হযরত আদম (عليه السلام) সৃষ্টি হবার ১৪ হাজার বছর পূর্বে আমি আমার রবের নিকট নূর ছিলাম।”

আল্লামা শাহ আব্দুল আজীজ মুহাদ্দিসে দেহলভী (رحمة الله) বলেন, ‘মাওয়াহিবুল্লা দুনিয়া’ স্বীয় যুগের অদ্বিতীয় কিতাব। (বুস্তানুল মুহাদ্দেসীন, ফার্সী ১১৯ পৃ.) (ফকীর আবুল হামেদ জিয়া উল্লাহ কাদেরী।)
২৪. ইমাম কাস্তাল্লানী, মাওয়াহেবুল্লাদুনীয়া, প্রথম খণ্ড, ১০০ পৃষ্ঠা, জুরকানী, শারহুল মাওয়াহেব, প্রথম খণ্ড, ৪৯ পৃষ্ঠা, শায়খ ইউসুফ নাবহানী, জাওয়াহিল বিহার, ৩/৭৭৬ পৃষ্ঠা ও আনওয়ারুল মুহাম্মদীয়া, ০৯ পৃষ্ঠা, এবং হুজ্জাতুল্লাহ আলাল আলামীন, ২৫১ পৃষ্ঠা, ইসমাঈল হাক্কী, তাফসীরে রুহুল বায়ান, ৩৭০ পৃষ্ঠা, দ্বিতীয় খণ্ড, এ হাদিসকে বর্তমানের বাতিলপন্থীগণ জাল বলে থাকেন, তাদের দাঁতভাঙা জবাব জানতে আমার লিখিত ‘প্রমাণিত হাদিসকে জাল বানানোর স্বরূপ উন্মোচন’ ১ম খণ্ডের ৬১১-৬১৬ পৃষ্ঠা দেখুন, আশাকরি সঠিক বিষয়টি আপনাদের বুঝে আসবে।

রাসূলে কারিম (ﷺ)’র এসব বাণী থেকে দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, রাসূল (ﷺ) তাঁর উম্মতের কাছে তাঁর নূরানিয়্যতের ব্যাপারে ঘোষণা করেছেন।

সুতরাং রাসূল (ﷺ)’র নূরানিয়তের ব্যাপারে যারা অস্বীকার করবে তাদের তরীকা মূলত রাসূল (ﷺ)’র পদ্ধতির বিপরীত। কবি বলেন:

خلاف پيبر كے را گز يہ ۞ ہر گز بمنزل نہ خواہد ريہ

‘‘প্রিয় নবীর (ﷺ) বিরোধীতা করবে যারা

মনযিলে মকসুদে কখনো পৌঁছবে না তারা।’’

আপনাদের সম্মূখে এখন রাসূলে করিম (ﷺ) এর প্রাণপ্রিয় এমন সাহাবায়ে কেরামদের আক্বীদা বর্ণনা করবো, যারা আমাদের জন্য পথ প্রদর্শক। কেননা রাসূল (ﷺ) নাযাত প্রাপ্ত দলের জন্য যে মানদণ্ড এবং কষ্টিপাথর নির্ধারণ করেছেন তা হল,

مَا أَنَا عَلَيْهِ وأصحابي

-“আমি এবং আমার সাহাবাগণ যার উপর আছে।”

খতিব তিবরিযি, মিশকাতুল মাসাবিহ, ১/৬১পৃ. কিতাবুল ই‘তিসাম বিস্-সুন্নাহ, হাদিস নং.১৬১, তিরমিযি, আস্-সুনান, ৫/২৬ পৃ. হাদিস, ২৬৪১, আহলে হাদিস আলবানী সুনানে তিরমিযির তাহক্বীকে হাদিসটি ‘হাসান’ বলেছেন, তাবরানী, মু‘জামুল কাবীর, ১৩/৩০ পৃ. হাদিস, ৬২, ১৪/৫২ পৃ. হাদিস, ১৪৬৪৬, মাকতুবাতু ইবনে তাইমিয়া, কাহেরা, মিশর, প্রকাশ.১৪১৫ হি. বায়হাকি, ই‘তিক্বাদ, ১/২৩৩ পৃ. বাগভী, শরহে সুন্নাহ, ১/২১৩ পৃ. হাদিস, ১০৪

অর্থাৎ আমি এবং আমার সাহাবাগণের আক্বীদাই হল তোমাদের আক্বীদার মানদন্ড।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর মোহরে নবুওয়াত।।

 পরিচ্ছেদঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দু’কাঁধের মধ্যভাগে মোহরে নবুওয়াত ছিল خاتم অর্থ- আংটি, মোহর, সীল। মোহরে নবুওয়াত হলো রা...