Saturday, 23 October 2021

মহানবী সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের জিকির সমুন্নত।

 


 



بِسْم اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْم

وَرَفَعْنَا لَكَ ذِكْرَكَ-] [

“এবং আমি আপনার জন্য আপনার ‘যিক্র’ (স্মরণ)কে সমুন্নত করেছি।”


সম্মানিত পাঠক, একটি সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, ওস্তাদের যিক্র (স্মরণ) কে শাগরেদ, মুর্শিদের যিক্র (স্মরণ) কে তাঁর সত্যিকার মুরীদ এবং দানশীল ব্যক্তির যিক্র (স্মরণ) কে তার দুয়ারের ভিখারী ও সাহায্যপ্রার্থী উন্নত করে, কিন্তু মাহবূব-ই আকরম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম ওই মহান ও মহত্বের অধিকারী সত্ত্বা, যাঁর ‘যিক্র শরীফ’ কে স্বয়ং খোদা তা‘আলা সমুন্নত করেছেন।


 র্ফশ ও আরশে হুযূর ’র যিকর

ক্বোরআন ও হাদীস অধ্যয়ন করার মাধ্যমে এ হাক্বীক্বত স্পষ্ট হয় যে, আল্লাহ্ তা‘আলা রসূল-ই আকরম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম-এর ‘যিক্র শরীফ’র চর্চা এত বেশি করেছেন যে, ফরশ-ই যমীন থেকে সুউচ্চ আরশ পর্যন্ত প্রত্যেক বস্তুকে তাঁর মহত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে অবগত করে দিয়েছেন। আ’লা হযরত ইমাম আহমদ রেযা খান রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি কতই সুন্দর বলেছেন-

عرش پہ تازہ چھیڑ چھاڑ فرش پہ طرفہ دھوم دھام

کان جدھر لگائیے تیری ہی داستاں ہے

“আরশের উপর তাজা তাজা আলোচনা, ফরশ (যমীন) এর উপর আজ উৎসব! যে দিকেই কান লাগাবেন, সেদিকে শুধু হে আল্লাহর রসূল“ আপনারই গুণগান শোনা যাচ্ছে!”


 সালাত ও সালাম-এর হাদিয়া

আসমানসমূহে তাঁর চর্চা এতবেশি হয়েছে যে, সকল আসমানের ফিরিশতা আল্লাহ্ তা‘আলার হুকুমে সারাক্ষণ তাঁর দরবারে দুরূদ ও সালামের নাযরানা পেশ করে হচ্ছে। ক্বোরআন মাজীদের পারা-২২, সূরা আহযাব-এ এসেছে,

إِنَّ اللّٰهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّوْنَ عَلَى النَّبِيِّ-] [

“নিশ্চয় আল্লাহ্ তা‘আলা এবং তাঁর ফিরিশতাগণ দুরূদ প্রেরণ করেন এ অদৃশ্যের সংবাদদাতা নবীর প্রতি।”


 বিশ্বকুলের প্রতিটি অণুকণা তাঁর সম্পর্কে অবগত

যমীনের উপর তাঁর ‘যিক্র শরীফ’-এর চর্চা হওয়ার একটি অর্থ এও রয়েছে যে, অবাধ্য জিন ও অবাধ্য মানবকুল ব্যতীত বিশ্বকুলের প্রতিটি অণু-পরমাণু তাঁর নবী ও রসূল হওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়বিশ্বাস রাখে। প্রত্যেককেই আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর মহত্ব ও মর্যাদার ‘ইল্ম’ (জ্ঞান) দান করেছেন। যেমন- হাদীস শরীফে রয়েছে,

مَا بَيْنَ السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ شَئْ ٌإلَّا يَعْلَمُ أَنِّي رَسُولُ اللّٰه إلَّا عَاصِيَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ-] [

“কাফির জিন ও কাফির মানবকুল ব্যতীত আসমান ও যমীনের মধ্যবর্তীতে যা কিছু রয়েছে, তারা আমার রসূল হওয়া সম্পর্কে অবগত।”


 ‘আদ্ববা- (عضبَاء) উষ্ট্রীর আশ্চর্যজনক ঘটনা

রসূল-ই আকরম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি উষ্ট্রী ছিল, যার নাম ছিল ‘আদ্ববা- (عضبَاء)। যখন এ উষ্ট্রী বন-জঙ্গলে বিচরণ করত, তখন জঙ্গলের ঘাস নিজ থেকেই সেটার নিকটবর্তী হয়ে যেত, যাতে সেটা কোন কষ্ট ছাড়াই তা খেতে পারে। আর জঙ্গলে সমস্ত হিং¯্রপ্রাণী সেটার জন্য রাস্তা ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে যেত, যাতে এটি কোন প্রকারের শঙ্কা অনুভব না করে। আর সেগুলো প্রাঞ্জলভাষায় বলতে থাকত-إِنَّكِ لمُحَمَّدٍ “হে ‘আদ্ববা-! আমরা তোমার আদব ও সম্মান এ কারণেই করছি যে, তুমি হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম-এর বাহন।”[ ] সুতরাং জানা গেল যে, আল্লাহ্ তা‘আলা রসূল-ই আকরম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম-এর ‘যিক্র শরীফ’র এত বেশি চর্চা করেছেন যে, বন-জঙ্গলে বসবাসকারী হিং¯্রজন্তু এবং যমীনে উৎপন্ন হওয়া ঘাসকে পর্যন্ত হুযূরের এবং হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম-এর উষ্ট্রীর ‘ইল্ম’ (জ্ঞান) দান করেছেন। আ’লা হযরত রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি সুন্দর বলেছেন-

چاند شق ہو پیڑ بولیں جانور سجدہ کریں

بارک اللہ مرجع عالم یہی سرکار ہے۔


“টুকরো হয় চাঁদ, গাছ কথা কয়, পশু সাজ্দায় পতিত হয়,

সুবহানাল্লাহ্! সৃষ্টির কেন্দ্র এই আসনেই সমাসীন।।”[ ] এ কারণে যখন তিনি নুবূয়তের ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং তাওহীদ ও রিসালতের উপর ঈমান আনার হুকুম দিয়েছিলেন, তখন পাথরের ভেতর থেকেও-

لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِ

-এর আওয়াজ এসেছিল। কবির ভাষায়-

؎ جس وقت گواہی کی ہوئی ان کو ضرورت

بت بول اُٹھے پڑھنے لگے کلمہ شجر بھی۔


“যে সময় তাদের সাক্ষ্যের প্রয়োজন হয়েছিল, মূর্তি বলে উঠেছিল, বৃক্ষ কলেমা পড়তে লাগল।”


 স্থানে স্থানে হুযূর ’র নাম ক্বুদরতের কলম লিখে দিয়েছে

যদিওবা হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর ‘যিক্র শরীফ’ কে বেশ কয়েকভাবে সমুন্নত করা হয়েছে, কিন্তু এখন আমরা শুধু এটি বর্ণনা করবো যে, ক্বুদরতের কলম যমীন ও আসমানের মধ্যে স্থানে স্থানে তাঁর বরকতময় নাম লিখে দিয়ে জগতের অনু-পরমাণুকে তাঁর সুমহান সত্ত্বা সম্পর্কে অবহিত করেছেন এবং তাদেরকে তাঁর নামের নূররাশি দ্বারা আলোকিত ও ফয়যপ্রাপ্ত করেছেন।


 আরশ-ই আ’যমের উপর হুযূর ’র নাম মুবারক

সায়্যিদুল মুফাস্সিরীন হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা রেওয়ায়াত করেন,

আল্লাহ্ তা‘আলা হযরত ঈসা আলায়হিস সালামকে ইরশাদ করেন:

يَا عِيْسٰى آمِنْ بِمُحَمَّدٍ وَمُرْ مَنْ أَدْرَكَهُ مِنْ أُمَّتِكَ أَنْ يُؤْمِنُوْا بِهِ فَلَوْلَا مُحَمَّدٌ مَا خَلَقْتُ آدَمَ، وَلَوْلَا مُحَمَّدٌ مَا خَلَقْتُ الْجنَّةَ وَالنَّارَ، وَلَقَدْ خَلَقْتُ الْعَرْشَ عَلَى الْمَاءِ فَاضْطَرَبَ فَكَتَبْتُ عَلَيْهِ لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِ فَسَكَنَ-] [

“হে ঈসা! (আলায়হিস সালাম) আমার মাহবূব মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর নিজে ঈমান আনো এবং আপন উম্মতকে নির্দেশ দাও যে, যারা তাঁর রহমতপূর্ণ সময় পাবে, তাঁর উপর যেন ঈমান আনে। কেননা যদি মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম না হতেন, তবে আমি না আদম আলায়হিস সালামকে সৃষ্টি করতাম (না তাঁর বংশধরদের) এবং না জান্নাত ও দোযখকে। (তাঁর মহত্বপূর্ণ শান এ যে,) যখন আমি পানির উপর আরশ বানিয়েছি, তখন আরশ কেঁপে উঠেছিল। অতঃপর আমি তার উপর লিখে দিলাম-

لَا إِلٰهَ إِلَّا اللهُ مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِ

(আমার এবং আমার মাহবূবের নামের বরকতে) আরশের অস্থিরতা দূর হয়ে গেল এবং সেটা প্রশান্ত ও স্থির হয়ে গেল।”


 অন্তরের অস্থিরতার একমাত্র চিকিৎসা

সপ্ত আসমান ও সপ্ত যমীন আরশ-ই মু‘আল্লার ঘেরাওয়ে রয়েছে। যমীন ও আসমান-এর মধ্যে সৃষ্টি হওয়া সবকিছুকে আরশ-ই মু‘আল্লা বেষ্টন করে রেখেছে। এতে অন্তর্ভূক্ত আছে ফিরিশতা, মানবকুল, জিনজাতি, প্রাণীকুল, জড়পদার্থসমূহ, উদ্ভিদরাজি, একক বস্তু এবং যৌগিক বিষয়াদিও। চার উপাদানও রয়েছে এবং সেগুলো থেকে বিন্যাসপ্রাপ্ত ও গঠনপ্রাপ্ত বস্তুসমূহও। যখন আরশ-ই মু‘আল্লা (যা এসব বস্তুকে বেষ্টন করে রেখেছে)-এর অস্থিরতা ও কাঁপুনি হুযূর করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বরকতময় নাম ছাড়া দূর হয় না, তাহলে যেসব বস্তু সর্বদা আরশের বেষ্টনে বিদ্যমান, সেগুলোর অস্থিরতা তাঁর নাম মুবারক ব্যতীত কীভাবে যেতে পারে?

সুতরাং প্রত্যেক অস্থির ও নিরুপায় মানুষের উচিত, সে রসূল-ই পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর নাম মুবারকের বেশি বেশি ওযীফা পড়বে এবং তাঁর পুত-পবিত্র শরী‘আতের অনুসরণ এবং পবিত্র সুন্নাতের পরিপূর্ণ আনুগত্য ও প্রতিপালন করবে, যাতে অস্থিরতার অসুখ এবং অসহিষ্ণুতার দুঃখ থেকে পরিত্রাণ পেয়ে প্রশান্তি ও স্থিরতা হাসিল করবে। এ রোগের চিকিৎসা এটি ছাড়া হতে পারে না। কেননা-

نام ہی نام ہَے جو کچھ ہے حقیقت کے سِوا

راستہ کوئی نہیں ان کی شریعت کے سِوا

فرض و واجب کے مراتب کا یہاں ہوش کہاں

مذہب عشق میں بولی نہیں سنت کے سِوا

شامیانہ نہیں خورشید قیامت کے لئے

کالی کملی کے سوا چادرِ عترت کے سِوا


১) হাক্বীক্বত ব্যতীত যা কিছু আছে, তা’তো নামই নাম। তাঁর শরীয়ত ব্যতীত কোন রাস্তা নেই।

২) ফরয-ওয়াজিবের মর্যাদাদির এখানে হুঁশই কোথায়?, ইশ্ক্বের মাযহাবে সুন্নাত অনুসারে কাজ করা ছাড়া কথা-ই নেই।

৩) ক্বিয়ামতের সূর্যের জন্য শামিয়ানা নেই, রসূলে আকরামের কালো রংয়ের চাদরই হলো আহলে বায়তের চাদর।


 লাওহ-ই মাহফূয-এর উপর সর্বপ্রথম আল্লাহ্ জাল্লাজালালুহু ও রসূল ’র নাম লিখা হয়েছে


আল্লাহ্ তা‘আলা যখন কলমকে সৃষ্টি করলেন, তখন সেটাকে হুকুম দিলেন: اُكْتُبْ )লিখ(। সেটা আরয করলো: مَاذَا اَكْتُبُ (কী লিখব?) ইরশাদ করলেন:

اُكْتُبِ الْقَدْرَ مَاكَان وَ مَا هُوَ كَائِنٌ إِلَى الْاَبَدِ-

“প্রথম দিন থেকে শেষ দিন পর্যন্ত যা কিছু হয়েছে এবং যা কিছু হবে, সেসব কিছু লিখে দাও।”[ ] তখন কলম নির্দেশ মোতাবেক সবকিছু লিখে দিয়েছে এবং সর্বপ্রথম নি¤েœাক্ত শব্দাবলি লিখেছে-

بِسْم اللهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْم، إِنِّيْ أَنَا اللهُ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنَا مُحَمَّدٌ رَسُوْلِيْ-] [

“আল্লাহ্র নামে আরম্ভ, যিনি পরম দয়ালু, করুণাময়। আমি আল্লাহ্, আমি ছাড়া কোন মা’বূদ নেই। হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আমার রসূল।”


 مَاكَان (যা কিছু হয়েছে) এবং وَمَا يكُوْن (যা কিছু হবে)-এর ইলম

এটা দ্বারা বুঝা গেল যে, আল্লাহ্ তা‘আলা, যিনি “كُنْ” বলে এক মুহুর্তে যা ইচ্ছা, সৃষ্টি করতে পারেন, তিনি শুধু “ اُكْتُبْ )লিখ(” বলে কলমকে সমস্ত مَاكَان (যা কিছু হয়েছে) এবং وَمَا يكُوْن (যা কিছু হবে)-এর ইলম দান করেছেন; সুতরাং সেটা তা লিখে ফেলেছে।

এও বুঝা গেল যে, রসূল-ই আকরম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম-এর ব্যাপারে এ আক্বীদা রাখা যে, তিনি আল্লাহ্ তা‘আলার অনুগ্রহে- مَاكَان (যা কিছু হয়েছে) এবং وَمَا يكُوْن (যা কিছু হবে) -এর ইলম জানতেন। এটি কখনো শিরক্ নয়। কেননা যখন আল্লাহ্ তা‘আলা “ اُكْتُبْ )লিখ(” বলে কলমকে সমস্ত مَاكَان (যা কিছু হয়েছে) এবং وَمَا يكُوْن (যা কিছু হবে)-এর ইলম দান করতে পারেন এবং তাতে র্শিক আবশ্যক হয় না, তাহলে হযরত মাহবূব-ই হক্ব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য এমন ইলম মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে কীভাবে র্শিক আবশ্যক হবে?


 কসীদাহ্-ই বুরদা শরীফের একটি শে’র

ইমাম শরফুদ্দীন বুসীরী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হি’র নিকট লাওহ্ ও কলমের ইলম হুযূর নবী করীম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম-এর ইলমের অংশ বিশেষ। শে’র দেখুন-

فَاِنَّ مِنْ جُوْدِك الدُّنْيَا و ضَرَّتَهاَ

وَمِنْ عُلُوْمِك عِلْمُ اللَّوْحِ وَ الْقَلَمِ

“ইয়া রাসূলাল্লাহ্! (সাল্লাল্লাহু আলায়কা ওয়াসাল্লাম) এ দুনিয়া এবং আখেরাত উভয় আপনারই বদান্যতার কারণে এবং লাওহ্ ও কলম-এর সমস্ত ইলম আপনারই ইলমের অংশ।”

তাহলে কোন মুশরিক বলে বেড়ানো মুফতী ইমাম বুসীরী রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলায়হির উপরও শিরকের ফাত্ওয়া লাগাবে!


 হযরত আদম আলায়হিস সালাম-এর হযরত শীস আলায়হিস সালাম-এর প্রতি ওসীয়ত

হযরত আবুল বশ্র সায়্যিদুনা আদম আলায়হিস সালাম স্বীয় সাহেবযাদা হযরত সায়্যিদুনা শীস আলায়হিস সালামকে নি¤েœ উল্লেখিত ওসীয়ত করেছেন:

كُلَّمَا ذَكَرْتَ اللهَ فَاذْكُرْ إِلٰى جَنْبِهِ اسْمَ مُحَمَّدٍ فَإِنِّي رَأَيْتُ اِسْمَهُ مَكْتُوْبًا عَلٰى سَاقِ الْعَرْشِ وَأَنَا بَيْنَ الرُّوْحِ وَالطِّيْنِ ثُمَّ إِنِّي طُوِّفْتُ فَلَمْ أَرَ فِي السَّمَاءِ مَوْضِعًا إِلَّا رَأَيْتُ اسْمَ مُحَمَّدًا مَكْتُوبًا عَلَيْهِ، وَلَمْ أَرَ فِي الْجَنَّةِ قَصْراً وَلَا غُرْفَةً إِلَّا وَرَأَيْتُ اسْم مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَكْتُوْبًا عَلَيْهِ، وَلَقَد رَأَيْتُ اسْمَ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَكْتُوْبًا عَلٰى نُحُوْرِ الْعَيْنِ، وعَلٰى قُضْبَاِن اٰجَامِ الْجَنَّةِ، وَعَلٰى وَرَقِ شَجَرَةِ طُوْبٰى، وَعَلٰى وَرَقِ سِدْرَةِ الْمُنْتَهٰى، وَعَلٰى أَطْرَافِ الْحُجُبِ، وَبَيْنَ أَعْيُنِ الْمَلَائِكَةِ، فَأَكْثِرْ ذِكْرَهُ فَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ تُذَكِّرُهُ فِيْ كُلِّ سَاعَاتِهَا

“হে আমার পুত্র! যখন তুমি আল্লাহ্ তা‘আলার নাম ‘যিক্র’ (স্মরণ) করবে, তখন সেটার সাথেই হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম-এর নামেরও ‘যিকর’ (স্মরণ) করবে। এ জন্য যে, আমি তাঁর নাম আরশ-ই মু‘আল্লার উপর, এমতাবস্থায় আমি রূহ ও মাটির মধ্যবর্তীতে ছিলাম; অতঃপর আমাকে প্রদক্ষিণ করানো হল এবং আসমানের প্রতিটি স্থানে, জান্নাতের মহলগুলো ও প্রাসাদসমূহের উপর, হুরদের বক্ষসমূহের উপর, জান্নাতের বৃক্ষরাজির শাখাগুলোর উপর, ত্বূ-বা বৃক্ষ ও সিদরাতুল মুনতাহার বৃক্ষের পত্র-পল্লবের উপর, পর্দাসমূহের কিনারাগুলোতে এবং ফিরশতাদের চোখযুগলের মধ্যবর্তী অংশের উপর লিখা দেখেছি। তাই হে আমার বৎস! তাঁর ‘যিক্র শরীফ’ অধিক পরিমাণে করবে; কেননা আল্লাহ্র ফিরিশতাকুল সদাসর্বদা তাঁর যিক্র করে থাকে।”[ ]


 মাহফিলে মীলাদ মুবারক

যেসব লোকেরা বর্তমান সময়ে মাহফিলে মীলাদ মুবারক আয়োজন করা থেকে বাধা দেয়, প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, তাদের আবুল বশর হযরত আদম আলায়হিস সালাম-এর উপর্যুক্ত ওসীয়ত থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। যখন আল্লাহ্ তা‘আলার পবিত্র ফিরিশতাকুল আল্লাহ্র হুকুমে সারাক্ষণ তাঁর প্রিয় মাহবূব হযরত মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম-এর ‘যিক্র শরীফ’ করছেন এবং হযরত আদম আলায়হিস সালাম স্বীয় সাহেবযাদাকে ‘যিক্রে মোস্তফা’ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম-এর বিশেষভাবে ওসীয়ত করেন, তাহলে ‘মাহফিলে যিকরে মোস্তফা’ সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লামকে না-জায়েয ও হারাম হওয়ার ফাত্ওয়া লাগানো কী পরিমাণ বোকামী, মুর্খতা, গোমরাহী ও বেয়াদবী! এমন লোক রসূল-ই আকরম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মত বলার কখনো হক্বদার নয়।

ذکر روکے فضل کاٹے نقص کا جو یا رہے

پھر کہے مردک کہ ہوں اُمّت رسُول اللہ کی

হুযূর সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে স্মরণ করতে বাধা দেয়, হুযূর-ই আকরামের ফযীলতকে অস্বীকার করে। তার মধ্যে দোষ-ত্রুটি তালাশ করে- এতদ্সত্তেও এ হীন ও ইতর (নজদী) নিজেকে হুযূর-ই আকরামের উম্মত বলে পরিচয় দেয়। (তাদের লজ্জাবোধ করা চাই! কিন্তু তারা তা করে না।)- হাদাইক্বে বখশিশ


 হযরত সুলায়মান আলায়হিস সালাম-এর আংটির উপর হুযূরের পবিত্র নাম

খোদা তা‘আলা জাল্লা মাজ্দুহু’র প্রিয় নবী সায়্যিদুনা সুলায়মান আলায়হিস সালাম একদিন আল্লাহ্ তা‘আলার দরবারে আরয করলেন:

رَبِّ اغْفِرْ لِيْ وَهَبْ لِيْ مُلْكًا لَّا يَنْبَغِيْ لِأَحَدٍ مِنْ بَعْدِي إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ-] [

“হে আমার রব! আমাকে ক্ষমা করো আর আমাকে এমন রাজ্য দান করো, যা আমার পর তা কারো জন্য উপযোগী না হয়, নিশ্চয় তুমি মহান দাতা।” (তরজমা-ই কানযুল ঈমান)

তাঁর দো‘আ কবূল হয়ে গেল, আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁকে আংটিতে রাখার জন্য একটি ‘নাগীনা’ (আংটির পাথর) দান করলেন। তিনি সেটাকে অংটির মধ্যে রেখে পরিধান করে নিলেন। ওই ‘নাগীনা’ (আংটির পাথর) এতবেশী বরকতপূর্ণ ছিল যে, সেটা পরিধান করতেই তিনি যুগের ‘শাহানশাহ্’ (বাদশাহ) হয়ে গেলেন। মানবকুল এবং জিনজাতিও তাঁর অনুগত হয়ে গেল। জিনেরা ছাড়াও পক্ষীকুল, হিং¯্রপ্রাণী, চতুষ্পদ জন্তু সবই তাঁর আনুগত্য করত এবং তাঁর অনুমতি ব্যতীত কোথাও যেত না। আল্লাহ্ তা‘আলার অনুগ্রহে বাতাসও তাঁর বশ্যতার অধীন হয়েছিল। তিনি যে স্থানে তাশরীফ নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছা করতেন, পবিত্র ‘তখত’ (আসন)-এ বসে বাতাসকে হুকুম দিতেন, সেটা উঠিয়ে নিয়ে যেত তাঁর কাক্সিক্ষত গন্তব্যে। তাঁর এ দৃষ্টান্তহীন রাজত্ব যমীনের শুধু কোন বিশেষ অংশে প্রতিষ্ঠিত হয় নি, বরং সমস্ত যমীনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। ওই ‘নাগীনা’ (আংটির পাথর)-এর মধ্যে এ বরকত ও মহত্ব সায়্যিদ-ই আলম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়া আলিহি ওয়াসাল্লাম-এর পবিত্র নামের বদৌলতে অর্জিত হয়েছিল।

হাদীস শরীফে রয়েছে, হযরত উবাদা ইবনে সামিত রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বলেন:

إِنَّ فَصَّ خَاتَمِ سُلَيْمَانَ بْنِ دَاوُدَ كَانَ سَمَاوِيًا: أَيْ مِنَ السَّمَاءِ، أُلْقِيَ إِلَيْهِ فَوَضَعَهُ فِيْ خَاتَمِهِ أَيْ وَكَانَ بِهِ اِنْتِظَامُ مُلْكِهِ، وَكَانَ نَقْشُهُ أَنَا اللهُ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنَا مُحَمَّدٌ عَبْدِيْ وَرَسُوْلِيْ-

“হযরত সুলায়মান আলায়হিস সালামের আংটির ‘নাগীনা’ (আংটির পাথর) আসমান থেকে নাযিল হয়েছিল। তিনি সেটাকে আংটির মধ্যে রেখেছিলেন। এর মাধ্যমে তাঁর রাজ্য ব্যবস্থাপনা চলত। তাতে নি¤েœাক্ত শব্দাবলি নক্বশা করা ছিল-

أَنَا اللهُ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنَا مُحَمَّدٌ عَبْدِيْ وَرَسُوْلِيْ

“আমি আল্লাহ্, আমি ছাড়া কোন মা’বূদ নেই; মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম আমার খাস বান্দা ও রসূল।”

(আলী ইবনে বোরহানুদ্দীন হালাবী, আস সীরাতুল হালাবিয়্যাহ্্, খ– ১, পৃ. ৩১৪)

সুতরাং বুঝা গেল যে, যদিওবা আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম সকল নবীর পর পার্থিব জগতে শুভাগমন করেছেন, কিন্তু তাঁর শুভ অবির্ভাবেরও পূর্বে তাঁর নাম মুবারক দ্বারা ফায়েদা হাসিল করা হত। শুধু উম্মতই নয়, বরং সম্মানিত নবীগণ আলায়হিমুস সালামও তাঁর বরকতসমূহ দ্বারা উপকৃত হতেন। আর এ আক্বীদাহ্ও স্পষ্ট হয়ে গেল, সায়্যিদুনা সুলায়মান আলায়হিস সালাম আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হিস সালাম-এর প্রনিনিধি হওয়ার ভিত্তিতে শাসন পরিচালনা করেন, প্রকৃতপক্ষে ওই সময়ও সরকার-ই রিসালত সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ্ তা‘আলা রাজত্ব ও বাদশাহীর ‘তাজ’ (মুকুট) দান করেছিলেন।

کیوں نہ ہو تم مالک مُلک خُدا مِلک خُدا

سب تمہارا ہے خُدا ہی جب تمہارا ہو گیا

“কেনই বা হবেন না আপনি খোদায়ী রাজ্যসভা ও প্রাচুর্যের মালিক, সবকিছু আপনারই, স্বয়ং খোদা তা‘আলা যে আপনার হয়ে গেছেন।”

পরিশেষে বলা যায়, ‘যিক্রে মোস্তফা’ ওই মহান ইবাদত, যা আল্লাহ্ তা‘আলা সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে বিস্তৃত করে দিয়েছেন। বর্তমান সময়েও অভিজ্ঞতা, ইতিহাস, খবরের কাগজ, মিডিয়ার বদৌলতে আমরা নিয়মিত জানতে ও দেখতে পারছি, বৃক্ষের পাতায় পাতায়, ফুলের পাপড়ীতে, মাছের গায়ে, ক্বোরবানীর পশুর গায়ে, গোশতের মধ্যে, আঙ্গুরের উপর, মেঘের উপর, শিশুর কাঁধের উপর, ছাগলের মাথার উপর, ব্যক্তির চোখের অভ্যন্তরে সাদা অংশের নিচে, পাথরের উপরসহ আরো বহু সংখ্যক সৃষ্টিতে দৃশ্যমান হচ্ছে, নবী পাক সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম-এর বরকতময় নাম ‘ مُحَمَّدٌ رَّسُوْلُ اللهِ’ (মুহাম্মদুর রসূলুল্লাহ্)। মহান রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে বেশি পরিমাণে হুযূরের ‘যিক্র শরীফ’ পাঠ করার তাওফীক্ব দান করুন। আ-মীন।


Sunday, 17 October 2021

সৃষ্টি কূলের সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী নবী করীম সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম।

 


 



## সৃষ্টিকুলে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী নবী মোস্তফা সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়াসাল্লাম।


আল্লাহ্ রাব্বুল আলামীন বিশে^ অগনিত ও অসংখ্য সৃষ্টি সৃজন করেছেন। সৃষ্টিকুলে শ্রেষ্ঠত্বের মুকুট দান করেছেন একমাত্র মানব জাতিকে। মানব জাতির মাঝে সর্বোচ্চ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বের সম্মানে আসীন করেছেন নবী ও রাসূলদেরকে। নবী ও রাসূলগণ সহ সৃষ্টিজগতে সর্বাধিক সম্মানিত ও মর্যাদাপূর্ণ আল্লাহ তায়ালার তরফ থেকে নবীগণের নবী সমগ্র বিশে^র রহমত হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। মহানবী নিজেই ঘোষণা করেন- সৃষ্টির সূচনা থেকে অন্ত পর্যন্ত আমিই সর্বাধিক সম্মানিত’’। এ সম্মানে ভূষিত করেছেন মহান রব তাঁর প্রিয় হাবিবকে। যার অধিক বর্ণনা রয়েছে পবিত্র কুরআন ও হাদিসে।

চিরাচরিত নিয়মে সন্তান পিতা-মাতাকে, শিক্ষার্থী শিক্ষাগুরুকে, অনুসারী অনুসৃতকে, ছোটজন বড়জনকে, কর্মচারী কর্মকর্তাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা করে থাকে। এর ব্যত্যয় ঘটলে ধৃষ্ঠতায় পর্যবসিত হয়ে থাকে বিজ্ঞজন সহ সকলের নিকট। এমনকি এর জন্য কঠিন শাস্তির মুখোমুখি হতে হয় অনেকাংশে। আবার এ সম্মান পরস্পর প্রদর্শিত না হলে সমাজ হয়ে পড়ে কলুষিত ও পতিত হয় ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তাই এ বিষয়টা মনে-প্রাণে সবাই মেনে নিলেও তাদের একাংশ বাদ সেধেছে প্রিয় নবীজির তাযিমের ক্ষেত্রে। দয়াল নবীর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের কথা আসলে চেহারা বিবর্ণ হয়ে যায় ওই অংশটির। এমনকি বিদায়াত-শিরিকসহ নানান কথা বলতে থাকে তারা। আল্লাহ তাআলার প্রিয় হাবিবের শানে অশালীন মন্তব্যের পক্ষে কোন তথ্য-উপাত্ত নেই বরং তা সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত। আদতে তাদের কাছে কুরআন-সুন্নাহর কোন দলীল-প্রমাণ আছে বলে মনে করার কারণ নেই। মহানবীর প্রতি সম্মান, প্রেম-ভালোবাসার ক্ষেত্রে তারা সর্বদা উন্নাসিকতা প্রকাশ করে যা আদৌ শোভনীয় নয় এবং সুস্থ বিবেক ও ইসলামি দর্শনের সরাসরি পরিপন্থী।

প্রিয় পাঠক! মনে রাখা দরকার- ঈমানের পরে দ্বিতীয় যেই কাজটি অপরিহার্য তা হচ্ছে দয়াল নবীর প্রতি অগাধ সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রকাশ করা। কথাটা দুনিয়ার কারো না স্বয়ং মহান রবের বাণী ও নির্দেশনা। যেমন ইরশাদ হচ্ছে, “যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওপর ঈমান আন এবং রাসূলের মহত্ব বর্ণনা ও (তাঁর প্রতি) সম্মান ও অগাধ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করো এবং সকাল-সন্ধ্যা আল্লাহর মহিমা প্রকাশ করো”। (সূরা ফাতাহ)। অর্থাৎ, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওপর ঈমান এনে মুসলমান হয়ে অন্যান্য আমলের পূর্বে দ্বিতীয় যেটা অনিবার্য, তা হচ্ছে তাঁর রাসূলের প্রতি সীমাহীন সম্মান-মর্যাদা প্রদর্শন। উদ্ধৃত আয়াতে সম্মানের বিধানটা নবীর সাথে সম্পৃক্ত আল্লাহর সাথে নয়, এটাই অধিকাংশ তাফসীরকারকদের অভিমত। মহানবীর প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান প্রকাশের শিক্ষা মহান রব পবিত্র কুরআনের মাধ্যমে উম্মতকে দিয়েছেন। তাইতো কুরআনের এই শিক্ষা উম্মতের শ্রেষ্ঠ মানুষ সাহাবায়ে কেরাম বাস্তবে প্রতিপালন করে অন্যান্যদের জন্য রেখে গেছেন উত্তম আদর্শরূপে।

আগেও বলেছি ছোট বড়জনকে, সন্তান মাতা-পিতাকে এবং একে অন্যকে সম্মান করার প্রথা আবহমান কাল থেকে সমাজে প্রচলিত এবং তা শরিয়তের নির্দেশও বটে। তাই স্বর্ণযুগের আলোকিত শ্রেষ্ঠ মুসলমান সাহাবায়ে কেরাম দয়াল নবীর প্রতি সীমাহীন সম্মান প্রদর্শন করেছেন যা সহীহ হাদিস দ্বারা প্রতিভাত। হাদিস শাস্ত্রের পাকা জহুরি ইমাম বুখারি রহমাতুল্লাহি আলায়হি প্রাসংগিক হাদিসটি স্ববিস্তার আলোকপাত করলেও আমি বিস্তার আলোচনায় না গিয়ে সংক্ষিপ্তরূপে তুলে ধরব সম্মানিত পাঠক সমাজের জন্যে, ফলে নবী বিদ্বেষীদের জোচ্চুরি ও উপাখ্যান উম্মোচিত হবে মেঘহীন সূর্যের আলোর মতো।

হাদিস স¤্রাট ইমাম বুখারি রহমাতুল্লাহি আলায়হি কিতাবুশ শুরুথ এর যুদ্ধ ও সমঝোতা পরিচ্ছেদে মনোজ্ঞ হাদিসটির বর্ণনায় উল্লেখ করেন- ষষ্ট হিজরিতে কাফিরদের কর্তৃক প্রায় দেড় হাজার সাহাবী সহ প্রিয় নবীজি হুদায়বিয়া নামক জায়গায় বাধার সম্মুখীন হলে মুসলমানদের শক্তি-সামর্থ যাচাই কল্পে কাফিরদের তরফ থেকে প্রতিনিধি হয়ে দক্ষ ও বিচক্ষণ ব্যক্তি উরওয়া বিন মাসউদ ছাকাফী (যিনি পরে সাহাবী হয়েছেন) ছদ্মবেশে সাহাবীদের মাঝে এসে পড়েন। সংগোপনে তিনি সবকিছু গভীর পর্যবেক্ষণ করে পবিত্র মক্কায় গিয়ে কাফিরদের নিকট পেশকৃত প্রতিবেদনের ফলে তাদের আশা ও ইচ্ছা তিরোহিত এবং যুদ্ধের মনোভাবে ভাটা পড়ে যায়।

উরওয়া বিন মাসউদ-এর চিত্তাকর্ষক বক্তব্যটি ছিল এমন- আমি আল্লাহ তায়ালার শপথ করে বলছি যে, নবী-আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন স্বীয় শ্লেষ্মা মোবারক নির্গত করেন তখন সাহাবীদের মাঝে কেউ না কেউ তা হাতে নিয়ে আপন চেহারা ও শরীরে মালিশ করতে থাকেন। নবী সাল্লøাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন কোন কিছুর নির্দেশ করেন, তড়িৎ তা পালনে তাঁরা লেগে পড়েন। তিনি যখন অযু করেন অযুর ব্যবহৃত পানি পাবার জন্য তাঁরা পরস্পর প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়ে থাকেন। যখন তিনি আলাপ করেন তখন তাঁরা স্বীয় স্বরকে নবীজির সম্মুখে নিচু করেন। অগাধ সম্মানের ফলে তাঁর দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকায় না। উরওয়া বিন মাসউদ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু আরও বলেন- আমি মহান রবের কসম করে বলছি, হে আমার সম্প্রদায়! মহামান্য রাজা-বাদশার দরবারে প্রতিনিধিরূপে আমি গমন করেছি। এমনকি কায়সার, কিসরা ও নাজাশীর দরবারেও আমার উপস্থিতি হয়েছে, কিন্তু আল্লাহর শপথ এমন কোন সম্রাট বা অধিপতিকে দেখি নি, যার রাজ কর্মকর্তা কিংবা সভাষদগণ তাকে এমন সম্মান ও শ্রদ্ধা করে থাকেন, যেমন মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথী তথা সাহাবীগণ তাঁর প্রতি নিবেদন করে থাকেন।

প্রিয় পাঠক! উদ্ধৃত হাদিসে দেখা যায় প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি সম্মানিত সাহাবীগণের ভক্তি-শ্রদ্ধার পরাকাষ্ঠা, যা মুসলিম সমাজের জন্যে শিক্ষনীয় কিয়ামত দিবস পর্যন্ত। একে অপরকে সম্মান করার কারণে অনেক কিছু মেনে নেওয়া যায়, যা বাস্তবে পরিলক্ষিত, আর এটাই ভক্তি-শ্রদ্ধার প্রতীক। কিন্তু শ্লেষ্মা যদি অন্যের জামাতেও পতিত হয় অনিচ্ছাকৃতভাবে, সর্বোচ্চ ভালবাসা ও সম্মান হৃদয়ে ধারন করার পরও এটা কেউ মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে না। তা কেউ হজম করবে এমন কাউকে এ পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া যাবেনা। বলাবাহুল্য প্রিয় নবীজির শ্লেষ্মা মোবারক সাহাবায়ে কেরাম নিজেরাই উৎসাহী হয়ে প্রচন্ড আগ্রহ নিয়ে সাদরে আপন শরীর ও চেহারায় মালিশ করেছেন। এর নজির পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। নবীজি নির্দেশ করেছেন বিধায় তা তাঁরা পালন করেছেন, এমন কথা হাদিসে নেই। বরং হাদিসে রয়েছে নিজ ইচ্ছায় তাঁরা তা করেছেন। এ অদ্ভুত ও বিষ্ময়কর প্রেম-ভালবাসা ও শ্রদ্ধাই হচ্ছে ঈমানের মূল।

আজকে মুসলিম সমাজের বিদ্যমান আবহ দেখে হৃদয়-মন হতাশ হয়ে যায়। যে নবীরপ্রেম ও তাযিম ঈমানের ভবিতব্য বিষয়, এটাকে বিদয়াত বলে প্রতিনিয়ত সরলপ্রাণ মুসলমানকে বিভ্রান্তির ফাঁদে ফেলে ঈমান হননের কাজে লিপ্ত কিছু লোক। স্বসম্মানে দাঁড়িয়ে দয়াল নবীজিকে সালাম দিলে বিদায়াতসহ বিভিন্ন রকমের অর্বাচীন ও উদ্ভট মন্তব্য করতে দ্বিধাবোধ করেনা। তাদের হাতে এ বিষয়ে কুরআন-সুন্নাহ সমর্থিত কোন তথ্য-উপাত্ত না থাকার পরও দুঃসাহস দেখায় সত্য পথ থেকে প্রেমিক ঈমানদারকে দূরে রাখার নিমিত্তে। অনেকেই ঋজুতায় তাদের প্রতারণায় পা দিয়ে সত্য থেকে ছিটকে পড়ছে এবং পড়ছে, যা খুবই দুঃখজনক।

গুনাহগার উম্মতের তরফ থেকে নবীজির প্রতি একটু-আধটু সম্মান যদি বিদায়াত কিংবা শিরিক হয়ে থাকে, তাহলে সাহাবায়ে কেরাম যাঁরা অগাধ ও সীমাহীন ভক্তি-শ্রদ্ধা নবিজির প্রতি প্রত্যেক মুহুর্তে নিবেদন করতেন তাঁদের বেলায় ওদের ফাতওয়ার কী হবে একবার ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করা প্রয়োজন। আসলে তা বিদয়াত-শিরিক নয় বরং নিঃসন্দেহে এটাই ঈমান, যা সাহাবায়ে কেরামের আমল থেকে দ্বীপ্তিমান। তাইতো নবিজী ইরশাদ করেছেন, আমি ও আমার সাহাবায়ে কেরাম যেই আক্বিদা-বিশ্বাস ও আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং যারা এটার অধিকারী তারাই একমাত্র-নাজাতপ্রাপ্ত দল তথা জান্নাতী আর অন্যান্যরা জাহান্নামের পথিক।

হযরত সিদ্দিক্বে আকবর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুসহ অন্যান্য সাহাবীগণ নামাযেও দয়াল নবীজিকে সম্মান প্রকাশ করেছেন, যার বর্ণনা সহীহ বুখারি সহ অন্যান্য হাদিস গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে। ইমাম মালেক, ইমাম জাফর সাদেক ও ইমাম মোহাম্মদ বিন মুনকাদির সহ অসংখ্য আইম্মায়ে কেরাম কেবল নবীজির পবিত্র সত্তার প্রতি অগাধ সম্মান প্রকাশ করতেন না, এমনকি হাদিস বলার সময় নবীজির হাদিসের প্রতি এতো বেশি ভক্তি-শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন, যার ফলে ওই সময় কারও চেহারার রং পরিবর্তন হতো, কেউ কেউ বসা থেকে শুয়ে পড়তেন, কারও অবস্থা এমন হতো যে মুখ গহ্বর পর্যন্ত শুকিয়ে যেত নবীর তাজিমে। যাদের মাধমে আজকে আমরা দ্বীন পেয়েছি তাঁরা কি কুরআন-সুন্নাহ সঠিকভাবে না বুঝে এমন কাজ করতেন? নিশ্চয়ই না। আর যারা বিরুদ্ধবাদী তারা কুরআন-সুন্নাহ সঠিকভাবে না বুঝেই শরিয়তকে বিকৃত করে দ্বীনকে বুঝতে এবং বুঝবার ব্যর্থ চেষ্টা করে। ফলে মুসলিম সমাজে নানা অশান্তি বিরাজ করছে। তা থেকে উত্তরণ না ঘটলে ভয়াবহ অবস্থার দিকে যাবে। এতে কোন সন্দেহ নেই।


Monday, 4 October 2021

আলা হযরতের জীবনী (৩য় খন্ড)


মাত্র ৩০দিনে হাফেজে কুরআন



আল্লাহ তাআলার রহমত তাঁর উপর বর্ষিত হোক, আর তাঁর সদকায় আমাদের বিনা হিসাবে মাগফিরাত হোক।


ﺍٰﻣِﻴﻦ ﺑِﺠﺎ ﻩِ ﺍﻟﻨَّﺒِﻰِّ ﺍﻟْﺎَﻣﻴﻦ ﺻَﻠَّﯽ ﺍﻟﻠﮧُ ﺗَﻌَﺎﻟٰﯽ ﻋَﻠَﯿْﮧِ ﻭَﺍٰﻟِﮧٖ ﻭَﺳَﻠَّﻢ


“কিছ্ তরেহ ইত্নে ইলম কে দরয়া বাহা দিয়ে


উলামায়ে হক্ব কি আকল তো হায়রান হে আজ ভি।”


ﺻَﻠُّﻮﺍ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﺤَﺒِﻴﺐ ! ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﺗَﻌَﺎﻟَﻰ ﻋَﻠﻰ ﻣُﺤَﻤَّﺪ


হযরত সায়্যিদ আইয়ুব আলী সাহিব ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ বর্ণনা করেন: “একদিন আ’লা হযরত ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ


বলেন: “আমার সম্পর্কে কিছু অনবহিত লোক আমার নামের আগে হাফেজ লিখে থাকেন, অথচ আমি পবিত্র কুরআনের হাফেজ নই।” সায়্যিদ আইয়ুব আলী সাহেব ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ আরও বর্ণনা করেন, “যেদিন আ’লা হযরত ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ এ কথা বলেছেন, সেদিন থেকে তিনি পবিত্র কুরআন শরীফ মুখস্থ করা শুরু করে দেন এবং ইশার নামাযের জন্য অযু করার পর থেকে জামাআত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি কুরআন শরীফ মুখস্থ করার জন্য সময় নির্ধারণ করে নেন। এভাবে তিনি দৈনিক এক পারা করে মাত্র ত্রিশ দিনে ত্রিশ পারা কুরআন শরীফ হিফজ করা শেষ করেন। এক জায়গায় তিনি


ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ

 বলেন যে, আমি কুরআন শরীফ ধারাবাহিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে মুখস্থ করি আর তা এজন্য যে, ঐসব আল্লাহর বান্দার কথা (যারা আমার নামের আগে হাফেজ লিখে দেয়) যেন ভূল প্রমাণিত না হয়। (হায়াতে আ’লা হযরত, ১ম খন্ড, ২০৮ পৃষ্ঠা, মাকতাবাতুল মদীনা, বাবুল মদীনা, করাচী)



আল্লাহ তাআলার রহমত তাঁর উপর বর্ষিত হোক, আর তাঁর সদকায় আমাদের বিনা হিসাবে মাগফিরাত হোক।


ﺍٰﻣِﻴﻦ ﺑِﺠﺎ ﻩِ ﺍﻟﻨَّﺒِﻰِّ ﺍﻟْﺎَﻣﻴﻦ ﺻَﻠَّﯽ ﺍﻟﻠﮧُ ﺗَﻌَﺎﻟٰﯽ ﻋَﻠَﯿْﮧِ ﻭَﺍٰﻟِﮧٖ ﻭَﺳَﻠَّﻢ


ﺻَﻠُّﻮﺍ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﺤَﺒِﻴﺐ ! ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﺗَﻌَﺎﻟَﻰ ﻋَﻠﻰ ﻣُﺤَﻤَّﺪ



নবীপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আ'লা হযরত



আমার আক্বা আ’লা হযরত ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ এর আপাদমস্তক রাসূল প্রেমের বাস্তব নমুনা ছিল। রাসূল (ﷺ) এর প্রশংসায় লিখিত তাঁর বিখ্যাত কাব্য গ্রন্থ “হাদায়েকে বখশিশ শরীফ” প্রিয় নবী, হুযুর করীম (ﷺ) এর প্রতি তাঁর অগাধ ভালবাসার সাক্ষ্য বহন করে। তাঁর ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ কলমের নিব নয় বরং অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে নির্গত উক্ত কাব্য গ্রন্থের প্রতিটি চরণ আক্বা (ﷺ) এর প্রতি তাঁর নজিরবিহীন ভালবাসার প্রমাণ দেয়। তিনি ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ কখনও দুনিয়ার রাজা বাদশাহ, আমীর ওমরাহ ও সম্রাটের সম্মানে বা প্রশংসায় কোন কবিতা রচনা করেন নি। কেননা তিনি রাসূল (ﷺ) এর আনুগত্য ও দাসত্বকে মনে প্রাণে কবুল করে নিয়েছিলেন। এতে উচ্চ পর্যায়ে পৌছেছিলেন। তিনি তাঁর এক কবিতায় রাসূল (ﷺ) এর প্রতি তাঁর আনুগত্য ও দাসত্বকে এভাবে বর্ণনা করেছে



▪ উনহে জানা উনহে মানা ন রাখা গাইর ছে 


লিল্লাহিল হামদ মে দুনিয়া ছে মুসলমান গেয়া


একদা “নানপারা” (জিলা বেহরাইচ, ইউপি, হিন্দ



প্রশাসনের নবাবের প্রশংসা ও গুন কীর্তনে তৎকালীন কবি সাহিত্যিকগণ অনেক কবিতা রচনা করে। কিছু লোক এসে আ’লা হযরত ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ কেও নবাবের প্রশংসায় কোন কবিতা লিখার জন্য আবেদন জানায় যে, হযরত! আপনিও নবাব সাহেবের প্রশংসায় কোন কবিতা লিখে দিন। তিনি ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ তাদের এ আবেদনের জবাবে একটি না’ত শরীফ লিখেন, যার প্রথম চরণ (মাত্লা*) নিম্ন



ওহ কামালে হুসনে হুযুর হে কে গুমানে নকছে জাহা নে


য়েহী ফুল খার ছে দূর হে য়েহী শামআ হে কে ধোঁয়া নে



কঠিন শব্দাবলীর অর্থ: কামাল= পরিপূর্ণ হওয়া, নকছ= অপূর্ণতা, ত্রুটি, খার= কা


কালামে রেযার ব্যাখ্যা: আমার আক্বা ﺻَﻠَّﯽ ﺍﻟﻠّٰﮧُ ﺗَﻌَﺎﻟٰﯽ ﻋَﻠَﯿْﮧِ ﻭَﺍٰﻟِﮧٖ ﻭَﺳَﻠَّﻢ এর সৌন্দর্য পরিপূর্ণতার স্তর পর্যন্ত পৌছেছে। অর্থাৎ প্রত্যেক দিক থেকে পরিপূর্ণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। এতে কোন ত্রুটি হওয়া তো দূরের কথা, ত্রুটির কল্পনাও করা যায় না। প্রত্যেক ফুলের ডালে কাটা থাকে কিন্তু আমেনার বাগানের এটি একটিই সুবাসিত ফুল হুযুর ﺻَﻠَّﯽ ﺍﻟﻠّٰﮧُ ﺗَﻌَﺎﻟٰﯽ ﻋَﻠَﯿْﮧِ ﻭَﺍٰﻟِﮧٖ ﻭَﺳَﻠَّﻢ এমন যে, যেটা কাঁটা থেকে পবিত্র। প্রত্যেক মোমবাতি এটা ত্রুটি যে, সেটা ধোয়া বের করে তবে তিনি বাজমে রিসালাতের এমন আলোকিত প্রদীপ যে, ধোঁয়া সমূহ অর্থাৎ প্রত্যেক প্রকারের দোষত্রুটি থেকে পবিত্র


----------------


*গজল বা কসিদার শুরুর শের যাতে উভয় মিসরার/পংক্তির মধ্যে মিল রয়েছে, তাকে মাত্লা বলা হ


------------------------


অতঃপর কবিতার শেষ চরণে (মাক্তায়*) তিনি অতি সূক্ষ্মভাবে “নানপারা” প্রশাসনের নবাবের সমালোচনা করেন। চরণটি নিম্নরূ



▪ করো মদহে আহলে দুওয়াল রেযা পড়ে ইস বালা মে মেরী বা


মে গদা হো আপনে করীম কা মেরা দ্বীন পারায়ে না নেহী



কঠিন শব্দাবলীর অর্থ: মদ্হা= প্রশংসা, দুওয়াল= সম্পদ জমা করা, পারায়ে না= রুটির টু


কালামে রেযার ব্যাখ্যা: তিনি এ চরণে বুঝাতে চেয়েছেন, আমি রাজা বাদশাহ, আমীর ওমরাহদের প্রশংসা কেন করব! আমিতো উভয় জাহানের সুলতান, রহমাতুল্লিল আলামিন ﺻَﻠَّﯽ ﺍﻟﻠّٰﮧُ ﺗَﻌَﺎﻟٰﯽ ﻋَﻠَﯿْﮧِ ﻭَﺍٰﻟِﮧٖ ﻭَﺳَﻠَّﻢ এর দরবারের ভিখারী। আমার ধর্ম পারায়ে নান নয়। উর্দূতে ‘নান’ শব্দের অর্থ রুটি এবং ‘পারা’ শব্দের অর্থ টুকরা। অর্থাৎ আমার ধর্ম রুটির টুকরা নয় যে, সে জন্য সম্পদশালীদের তোষামোদ করতে থাক


------------------


*কালামের শেষের শের যাতে কবির কবিত্বমূলক নাম থাকে, তাকে মাকতা বলা হ


------------------------


ﺻَﻠُّﻮﺍ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﺤَﺒِﻴﺐ ! ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﺗَﻌَﺎﻟَﻰ ﻋَﻠﻰ ﻣُﺤَﻤَّ


আমার আক্বা আ’লা হযরত ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ যখন দ্বিতীয়বার হজ্ব পালন করতে মদীনা শরীফ গিয়েছিলেন, তখন মদীনা শরীফে তিনি ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ রাসূল (ﷺ) এর দীদার লাভের আশায় দীর্ঘক্ষণ যাবৎ রাসূল (ﷺ) এর রওজা মোবারকের সামনে সালাত ও সালাম পাঠ করতে থাকেন। কিন্তু প্রথম রাতে রাসূল (ﷺ) এর দীদার লাভের সৌভাগ্য ছিল না। তাই তিনি সেখানে বসে রাসূলে আকরাম (ﷺ) এর শানে প্রশংসামূলক গজল লিখেছিলেন; যার প্রথম চরণে তিনি রাসূল (ﷺ) এর দীদার লাভের আকাঙ্খা করেছিলেন। চরণটি নিম্নরূ



ওহ ছুয়ে লালা যার পিরতে


তেরে দিন এ বাহার পিরতে হে



কালামে রেযার ব্যাখ্যা: হে (বাহার) বসন্ত আন্দোলিত হও! এজন্য যে, তোমার বসন্তের উপর বসন্ত আগমণ কারী। ঐ দেখ! মদীনার তাজেদার (ﷺ) লালা যারের দিকে অর্থাৎ বাগানের দিকে তাশরীফ আন


কবিতার শেষ চরণে নিজের বিনয় ও নম্রতা এবং অসহায়ত্বের চিত্র এভাবে তুলে ধরে



কুয়ী কিউ পুছে তেরী বাত রে


তুজ ছে শায়দা হাজার পিরতে হে



(এ চরণের ২য় লাইনে আ’লা হযরত ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ বিনয় প্রকাশ করে নিজের জন্য কুকুর শব্দ ব্যবহার করেছেন। কিন্তু লিখক আ’লা হযরত ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থে কুকুরের জায়গায় শায়দা বা ‘আশিক’ লিখে দিয়েছে



কালামে রেযার ব্যাখ্যা: এই শেষ চরণে নবী প্রেমিক ছরকারে আ’লা হযরত চরম বিনয় প্রকাশ করতে গিয়ে নিজেকে নিজে বলতে লাগলেন: হে আহমদ রেযা! তুমি কে! আর তোমার বাস্তবতায় বা কি! তোমার মত তো হাজার হাজার মদীনার কুকুর গলী সমূহে এদিক সেদিক ঘুরাফেরা ক


এ গজল আরজ করার পর তিনি (ﷺ) এর দীদার লাভের অপেক্ষায় আদবের সাথে বসে রইলেন। হঠাৎ তাঁর ভাগ্য প্রসশ্ত হয়ে গেল। জাগ্রত অবস্থায় নিজ চোখে রাসূল (ﷺ) এর দীদার লাভের সৌভাগ্য তাঁর নসীব হয়ে গে


আল্লাহ তাআলার রহমত তাঁর উপর বর্ষিত হোক, আর তাঁর সদকায় আমাদের বিনা হিসাবে ক্ষমা হো


ﺍٰﻣِﻴﻦ ﺑِﺠﺎ ﻩِ ﺍﻟﻨَّﺒِﻰِّ ﺍﻟْﺎَﻣﻴﻦ ﺻَﻠَّﯽ ﺍﻟﻠﮧُ ﺗَﻌَﺎﻟٰﯽ ﻋَﻠَﯿْﮧِ ﻭَﺍٰﻟِﮧٖ ﻭَﺳَﻠَّ


ﺳُﺒْﺤٰﻦَ ﺍﻟﻠﻪِ ﻋَﺰَّﻭَﺟَ

নবীপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আ'লা হযরত

____________________

নবীপ্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আ'লা হযরত



আমার আক্বা আ’লা হযরত ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ এর আপাদমস্তক রাসূল প্রেমের বাস্তব নমুনা ছিল। রাসূল (ﷺ) এর প্রশংসায় লিখিত তাঁর বিখ্যাত কাব্য গ্রন্থ “হাদায়েকে বখশিশ শরীফ” প্রিয় নবী, হুযুর করীম (ﷺ) এর প্রতি তাঁর অগাধ ভালবাসার সাক্ষ্য বহন করে। তাঁর ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ কলমের নিব নয় বরং অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে নির্গত উক্ত কাব্য গ্রন্থের প্রতিটি চরণ আক্বা (ﷺ) এর প্রতি তাঁর নজিরবিহীন ভালবাসার প্রমাণ দেয়। তিনি ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ কখনও দুনিয়ার রাজা বাদশাহ, আমীর ওমরাহ ও সম্রাটের সম্মানে বা প্রশংসায় কোন কবিতা রচনা করেন নি। কেননা তিনি রাসূল (ﷺ) এর আনুগত্য ও দাসত্বকে মনে প্রাণে কবুল করে নিয়েছিলেন। এতে উচ্চ পর্যায়ে পৌছেছিলেন। তিনি তাঁর এক কবিতায় রাসূল (ﷺ) এর প্রতি তাঁর আনুগত্য ও দাসত্বকে এভাবে বর্ণনা করেছেন:



▪ উনহে জানা উনহে মানা ন রাখা গাইর ছে কাম,


লিল্লাহিল হামদ মে দুনিয়া ছে মুসলমান গেয়া।


একদা “নানপারা” (জিলা বেহরাইচ, ইউপি, হিন্দ)



প্রশাসনের নবাবের প্রশংসা ও গুন কীর্তনে তৎকালীন কবি সাহিত্যিকগণ অনেক কবিতা রচনা করে। কিছু লোক এসে আ’লা হযরত ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ কেও নবাবের প্রশংসায় কোন কবিতা লিখার জন্য আবেদন জানায় যে, হযরত! আপনিও নবাব সাহেবের প্রশংসায় কোন কবিতা লিখে দিন। তিনি ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ তাদের এ আবেদনের জবাবে একটি না’ত শরীফ লিখেন, যার প্রথম চরণ (মাত্লা*) নিম্নরূপ-



ওহ কামালে হুসনে হুযুর হে কে গুমানে নকছে জাহা নেহী,


য়েহী ফুল খার ছে দূর হে য়েহী শামআ হে কে ধোঁয়া নেহী।



কঠিন শব্দাবলীর অর্থ: কামাল= পরিপূর্ণ হওয়া, নকছ= অপূর্ণতা, ত্রুটি, খার= কাটা


কালামে রেযার ব্যাখ্যা: আমার আক্বা ﺻَﻠَّﯽ ﺍﻟﻠّٰﮧُ ﺗَﻌَﺎﻟٰﯽ ﻋَﻠَﯿْﮧِ ﻭَﺍٰﻟِﮧٖ ﻭَﺳَﻠَّﻢ এর সৌন্দর্য পরিপূর্ণতার স্তর পর্যন্ত পৌছেছে। অর্থাৎ প্রত্যেক দিক থেকে পরিপূর্ণ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ। এতে কোন ত্রুটি হওয়া তো দূরের কথা, ত্রুটির কল্পনাও করা যায় না। প্রত্যেক ফুলের ডালে কাটা থাকে কিন্তু আমেনার বাগানের এটি একটিই সুবাসিত ফুল হুযুর ﺻَﻠَّﯽ ﺍﻟﻠّٰﮧُ ﺗَﻌَﺎﻟٰﯽ ﻋَﻠَﯿْﮧِ ﻭَﺍٰﻟِﮧٖ ﻭَﺳَﻠَّﻢ এমন যে, যেটা কাঁটা থেকে পবিত্র। প্রত্যেক মোমবাতি এটা ত্রুটি যে, সেটা ধোয়া বের করে তবে তিনি বাজমে রিসালাতের এমন আলোকিত প্রদীপ যে, ধোঁয়া সমূহ অর্থাৎ প্রত্যেক প্রকারের দোষত্রুটি থেকে পবিত্র।


--------------------


*গজল বা কসিদার শুরুর শের যাতে উভয় মিসরার/পংক্তির মধ্যে মিল রয়েছে, তাকে মাত্লা বলা হয়।


--------------------------


অতঃপর কবিতার শেষ চরণে (মাক্তায়*) তিনি অতি সূক্ষ্মভাবে “নানপারা” প্রশাসনের নবাবের সমালোচনা করেন। চরণটি নিম্নরূপ:



▪ করো মদহে আহলে দুওয়াল রেযা পড়ে ইস বালা মে মেরী বালা,


মে গদা হো আপনে করীম কা মেরা দ্বীন পারায়ে না নেহী।



কঠিন শব্দাবলীর অর্থ: মদ্হা= প্রশংসা, দুওয়াল= সম্পদ জমা করা, পারায়ে না= রুটির টুকরা।


কালামে রেযার ব্যাখ্যা: তিনি এ চরণে বুঝাতে চেয়েছেন, আমি রাজা বাদশাহ, আমীর ওমরাহদের প্রশংসা কেন করব! আমিতো উভয় জাহানের সুলতান, রহমাতুল্লিল আলামিন ﺻَﻠَّﯽ ﺍﻟﻠّٰﮧُ ﺗَﻌَﺎﻟٰﯽ ﻋَﻠَﯿْﮧِ ﻭَﺍٰﻟِﮧٖ ﻭَﺳَﻠَّﻢ এর দরবারের ভিখারী। আমার ধর্ম পারায়ে নান নয়। উর্দূতে ‘নান’ শব্দের অর্থ রুটি এবং ‘পারা’ শব্দের অর্থ টুকরা। অর্থাৎ আমার ধর্ম রুটির টুকরা নয় যে, সে জন্য সম্পদশালীদের তোষামোদ করতে থাকব।


--------------------


*কালামের শেষের শের যাতে কবির কবিত্বমূলক নাম থাকে, তাকে মাকতা বলা হয়।


--------------------------


ﺻَﻠُّﻮﺍ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﺤَﺒِﻴﺐ ! ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﺗَﻌَﺎﻟَﻰ ﻋَﻠﻰ ﻣُﺤَﻤَّﺪ


আমার আক্বা আ’লা হযরত ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ যখন দ্বিতীয়বার হজ্ব পালন করতে মদীনা শরীফ গিয়েছিলেন, তখন মদীনা শরীফে তিনি ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ রাসূল (ﷺ) এর দীদার লাভের আশায় দীর্ঘক্ষণ যাবৎ রাসূল (ﷺ) এর রওজা মোবারকের সামনে সালাত ও সালাম পাঠ করতে থাকেন। কিন্তু প্রথম রাতে রাসূল (ﷺ) এর দীদার লাভের সৌভাগ্য ছিল না। তাই তিনি সেখানে বসে রাসূলে আকরাম (ﷺ) এর শানে প্রশংসামূলক গজল লিখেছিলেন; যার প্রথম চরণে তিনি রাসূল (ﷺ) এর দীদার লাভের আকাঙ্খা করেছিলেন। চরণটি নিম্নরূপ:



ওহ ছুয়ে লালা যার পিরতে হে,


তেরে দিন এ বাহার পিরতে হে।



কালামে রেযার ব্যাখ্যা: হে (বাহার) বসন্ত আন্দোলিত হও! এজন্য যে, তোমার বসন্তের উপর বসন্ত আগমণ কারী। ঐ দেখ! মদীনার তাজেদার (ﷺ) লালা যারের দিকে অর্থাৎ বাগানের দিকে তাশরীফ আনছেন!


কবিতার শেষ চরণে নিজের বিনয় ও নম্রতা এবং অসহায়ত্বের চিত্র এভাবে তুলে ধরেন:



কুয়ী কিউ পুছে তেরী বাত রেযা,


তুজ ছে শায়দা হাজার পিরতে হে।



(এ চরণের ২য় লাইনে আ’লা হযরত ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ বিনয় প্রকাশ করে নিজের জন্য কুকুর শব্দ ব্যবহার করেছেন। কিন্তু লিখক আ’লা হযরত ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ এর প্রতি সম্মান প্রদর্শনার্থে কুকুরের জায়গায় শায়দা বা ‘আশিক’ লিখে দিয়েছেন।)



কালামে রেযার ব্যাখ্যা: এই শেষ চরণে নবী প্রেমিক ছরকারে আ’লা হযরত চরম বিনয় প্রকাশ করতে গিয়ে নিজেকে নিজে বলতে লাগলেন: হে আহমদ রেযা! তুমি কে! আর তোমার বাস্তবতায় বা কি! তোমার মত তো হাজার হাজার মদীনার কুকুর গলী সমূহে এদিক সেদিক ঘুরাফেরা করছে।


এ গজল আরজ করার পর তিনি (ﷺ) এর দীদার লাভের অপেক্ষায় আদবের সাথে বসে রইলেন। হঠাৎ তাঁর ভাগ্য প্রসশ্ত হয়ে গেল। জাগ্রত অবস্থায় নিজ চোখে রাসূল (ﷺ) এর দীদার লাভের সৌভাগ্য তাঁর নসীব হয়ে গেল।


আল্লাহ তাআলার রহমত তাঁর উপর বর্ষিত হোক, আর তাঁর সদকায় আমাদের বিনা হিসাবে ক্ষমা হোক।


ﺍٰﻣِﻴﻦ ﺑِﺠﺎ ﻩِ ﺍﻟﻨَّﺒِﻰِّ ﺍﻟْﺎَﻣﻴﻦ ﺻَﻠَّﯽ ﺍﻟﻠﮧُ ﺗَﻌَﺎﻟٰﯽ ﻋَﻠَﯿْﮧِ ﻭَﺍٰﻟِﮧٖ ﻭَﺳَﻠَّﻢ


ﺳُﺒْﺤٰﻦَ ﺍﻟﻠﻪِ ﻋَﺰَّﻭَﺟَﻞ !





আলা হযরতের জীবনী (২য় খন্ড)।

 আলা হযরতের কুরআন শিক্ষা ও প্রখর স্মৃতিশক্তি।


 আ'লা হযরতের কুরআন শিক্ষা ও প্রখর স্মৃতিশক্তি জনাব সায়্যিদ আইয়ুব আলী শাহ সাহেব ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ বর্ণনা করেন: শৈশব কালে তিনি ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ কে পবিত্র কুরআন শিক্ষা দেয়ার জন্য জনৈক মাওলানা সাহেব তার ঘরে আসতেন। একদিনের বর্ণনা: মাওলানা সাহেব পবিত্র কুরআনের কোন আয়াতে করীমার কোন এক শব্দের হরকত তাঁকে বারবার বলার পরও তাঁর ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ মুখ থেকে তা বের করতে পারলেন না, বরং তাঁর মুখ মোবারক থেকে মাওলানা সাহেব যেরূপ বলেছিলেন তার বিপরীতই বের হল। মাওলানা সাহেব শব্দটিতে ‘যবর’ উচ্চারণ করলেন কিন্তু। আ’লা হযরত ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ তাতে “যের” উচ্চারণ করলেন। এ অবস্থা দেখে আ’লা হযরতের ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ পিতামহ হযরত মাওলানা রেযা আলী খান সাহেব ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ তাঁকে (আ’লা হযরত) ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ তাঁর নিকট ডাকলেন এবং কুরআন শরীফ আনার জন্য বললেন। তিনি কুরআন শরীফ খুলে দেখলেন যে, উক্ত শব্দে কোন লিখক ভুলে যেরের স্থানে যবর লিখে দিয়েছে। প্রকৃতপক্ষে আ’লা হযরতের পবিত্র জবানে যা উচ্চারিত হয়েছিল, তাই সঠিক ছিল। তাঁর পিতামহ তাঁকে (আ’লা হযরতকে) জিজ্ঞাসা করলেন: “বৎস! মাওলানা সাহেব তোমাকে যেরূপ বলেছিলেন তুমি সেরূপ বলনি কেন? আরজ করলেন: “আমি মাওলানা সাহেবের মত উচ্চারণ করতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু আমি আমার জবানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি।” আ’লা হযরত ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ নিজেই বলেছেন যে: আমার উস্তাদ যার থেকে আমি ইবতেদায়ী কিতাব সমূহ পড়তাম। যখন আমাকে সবক পড়ানো হত। আমি এক দু’বার দেখে কিতাব বন্ধ করে দিতাম। যখন সবক শুনতেন তখন অক্ষরে অক্ষরে শব্দে শব্দে শুনিয়ে দিতাম। প্রতিদিন এই অবস্থা দেখে তিনি খুবই আশ্চর্য হতেন। তিনি একদিন আমাকে বললেন: “প্রিয় বৎস আহমদ! তুমি বল, তুমি কি মানুষ না জ্বিন? আমার পড়াতে দেরী হয় কিন্তু তোমার মুখস্থ করতে দেরী হয় না!” তিনি ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ বললেন: “আল্লাহর তা আলার জন্য সকল প্রশংসা, আমি মানুষ। তবে আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ লাভে ধন্য হয়েছি।” (হায়াতে আ’লা হযরত, ১ম খন্ড, ৬৮ পৃষ্ঠা, মাকতাবাতুল মদীনা, বাবুল মদীনা, করাচী) আল্লাহ তা‘আলার রহমত তাঁর উপর বর্ষিত হোক এবং তাঁর সদকায় আমাদের বিনা হিসাবে ক্ষমা হোক।

 

আ'লা হযরতের প্রথম ফতোয়া



আমার আক্বা আ’লা হযরত ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ এর বয়স যখন মাত্র তের বৎসর দশ মাস চারদিন হয়েছিল, তখন তিনি তাঁর পিতা বিখ্যাত তর্কশাস্ত্রবিদ মাওলানা নকী আলী খান ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ এর নিকট দুনিয়ার যাবতীয় প্রচলিত জ্ঞানের শিক্ষা সম্পন্ন করে তাঁর নিকট থেকে শিক্ষা সমাপনী সনদ গ্রহণ করেন। যেদিন সনদ গ্রহণ করেন, সে দিনই তিনি একটি প্রশ্নের জবাবে ফতোয়া লিখে জীবনে প্রথম ফতোয়া দানের কৃতিত্ব অর্জন করেন। তাঁর লিখিত ফতোয়াটি সঠিক ও নির্ভূল দেখে তাঁর পিতা তাঁকে মসনাদে ইফতা তথা ফতোয়া দানের আসনে সমাসীন করান এবং তাঁকে ফতোয়া দানের ক্ষমতা অর্পন করেন। অতঃপর তিনি তাঁর ﺭﺣﻤﺔ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ শেষ জীবন পর্যন্ত ফতোয়া দিতে থাকেন। (হায়াতে আলা হযরত, ১ম খন্ড, ২৭৯ পৃষ্ঠা, মাকতাবাতুল মদীনা, বাবুল মদীনা, করাচী) আল্লাহ তাআলার রহমত তাঁর উপর বর্ষিত হোক, আর তাঁর সদকায় আমাদের বিনা হিসাবে ক্ষমা হোক।


ﺍٰﻣِﻴﻦ ﺑِﺠﺎ ﻩِ ﺍﻟﻨَّﺒِﻰِّ ﺍﻟْﺎَﻣﻴﻦ ﺻَﻠَّﯽ ﺍﻟﻠﮧُ ﺗَﻌَﺎﻟٰﯽ ﻋَﻠَﯿْﮧِ ﻭَﺍٰﻟِﮧٖ ﻭَﺳَﻠَّﻢ


ﺻَﻠُّﻮﺍ ﻋَﻠَﻰ ﺍﻟﺤَﺒِﻴﺐ ! ﺻَﻠَّﻰ ﺍﻟﻠﻪُ ﺗَﻌَﺎﻟَﻰ ﻋَﻠﻰ ﻣُﺤَﻤَّﺪ





 

Sunday, 3 October 2021

হুজুরের আকরাম সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুনাহগার উম্মতের শাফায়াত কারী।

 


## হুযূর-ই আকরাম শাফী‘উল মুযনিবীন [গুনাহগারদের পক্ষে সুপারিশকারী]



## আল্লাহ্ তা’আলা ক্বোরআন মজীদে এরশাদ করেছেন-

مَنْ ذَا الَّذِىْ يَشْفَعُ عِنْدَه اِلَّا بِاِذْنِه-

তরজমা: সে কে, যে তাঁর সম্মুখে সুপারিশ করবে, তাঁর অনুমতি ব্যতিরেকে? [সূরা বাক্বারা: আয়াত- ৫৫: কান্যুল ঈমান] ক্বিয়ামতের সঙ্কটপূর্ণ মুহূর্তে গুনাহগারগণ যখন আটকা পড়বে, তখন আল্লাহর দরবারে তাদের পক্ষে সুপারিশ করে দোযখের কঠিন শাস্তি থেকে মুক্তি দেওয়া সম্ভবপর কিনা? সম্ভব হলেও কাদের পক্ষে কে সুপারিশ করবেন? শাফা‘আত বা সুপারিশ কত প্রকার ও কি কি? এসব প্রশ্ন যখন সামনে আসছে, তখন সেগুলোর জবাব পাবার কৌতুহল জাগা স্বাভাবিক। উপরে উল্লিখিত আয়াতাংশে এসব প্রশ্নের জবাব রয়েছে।

এটা আয়াতুল কুরসীর একাংশ। আয়াতুল কুরসীতে বিশেষত: কাফির ও বদ মাযহাবীদের খন্ডন রয়েছে; যেসব লোক মহান শ্রষ্টাকে অস্বীকার করতো, তাদের খন্ডন করা হয়েছে আয়াতটির প্রথম শব্দ ‘আল্লাহ্’ দ্বারা। যারা একাধিক ¯্রষ্টা আছে বলে ভ্রান্ত বিশ্বাসের শিকার, তাদের খন্ডন করা হয়েছে ‘লা-ইলা-হা ইল্লা-হুয়া’ (তিনি ব্যতীত কোন মা’বূদ নেই) দ্বারা। যারা আল্লাহর গুনাবলীকে অস্বীকার করে, তাদের খন্ডন করা হয়েছে ‘আল-হাইয়্যুল ক্বাইয়্যুম’ ইত্যাদি দ্বারা। এভাবে গোটা আয়াতটি বিশেষত: কাফিরদের খণ্ডন করে। কাফিরগণ তাদের বোতগুলো সম্পর্কে দু’টি মারাত্মক ভ্রান্ত আক্বীদা পোষণ করতো: এক. সেগুলোর মধ্যে ‘উলুহিয়াৎ’ (খোদাত্ব) অনুপ্রেবেশ করেছে; যেমন ফুলের মধ্যে খুশ্বু। এজন্য তারা বোতগুলোকে ইলাহ্ও মানে, আবার সেগুলোর শরীকগণ রয়েছে বলেও বিশ্বাস করে। তবে খোদাকে ইলাহ্-ই আকবার বলতো। দুই. এ মূর্তিগুলো ছোট খোদা। আর এগুলো বড় খোদার নিকট সুপারিশ করবে। এমনকি এগুলো বড় খোদাকে ধওঁস বা দাপট দেখিয়ে সুপারিশগুলো মেনে নিতে বাধ্য করবে। না‘ঊযুবিল্লাহ্! এ আয়াতে তাদের এ দু’ভ্রান্ত বিশ্বাসের খণ্ডন করা হয়েছে। এ আয়াতাংশে আল্লাহ্ তা‘আলা এরশাদ ফরমায়েছেন- আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত কারো মুখ খোলার সাহসই হবে না। সুতরাং তাঁর অনুমতি ব্যতিরেকে শাফা‘আত কিভাবে করবে? যেন এরশাদ হয়েছে- শাফা‘আত শুধু তিনিই করবেন, যাঁকে অনুমতি দেওয়া হবে। আর বোত-প্রেতগুলো অনুমতি পাবার যোগ্যই নয়। বাকী রইলো দাপট (ধওঁস) দেখিয়ে সুপারিশ মানানো। বস্তুত! আল্লাহ্ তা‘আলার উপর কারো দাপট চলতেই পারে না।

দ্বিতীয়ত: এ আয়াতে আল্লাহ্র অনুমতিক্রমে সুপারিশের পক্ষে অকাট্য প্রমাণ রয়েছে। সুতরাং আয়াতটি শাফা‘আতকে অস্বীকার করার জন্য নয়, বরং তা শাফা‘আতের পক্ষে প্রমাণ বহন করে।

তাছাড়া, শাফা‘আত যদি না-জায়েয কিংবা অসম্ভব হতো, তবে নামাযে জানাযাহ্, যিয়ারতে ক্বুবূর এবং জীবিত মুসলমানদের দো‘আ মৃত মুসলমানদের জন্য অকেজো হয়ে যেতো। কারণ, এগুলো তো সুপারিশই। না-বালেগ শিশুদের জানাযায় তো পরিষ্কার ভাষায় বলা হয়- وَاجْعَلْهُ لَنَا شَافِعًا ومشفعًا (এবং হে আল্লাহ্! তাকে আমাদের জন্য সুপারিশকারী কারো।) বড়দের জন্য আমরা সুপারিশকারী (দো‘আকারী) হই আর ছোটদেরকে আমাদের জন্য সুপারিশকারী বানাই।

হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুমা তাঁর সন্তানের জানাযার জন্য চল্লিশজন নামাযী ব্যক্তি হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলেন। কারণ, যেখানে চল্লিশজন নেক্কার মুসলমান একত্রিত হন, সেখানে কেউ অবশ্যই ওলী থাকেন। [মিরক্বাত] সুতরাং যদি জানাযার নামাযে চল্লিশজন মুসলমান একত্রিত হন, তবে তাঁদের মধ্যে কোন একজন ওলী থাকেন, ওলীর সুপারিশ আল্লাহ্ তা‘আলার দরবারে কবূল হয়।

সুপারিশ করবেন সম্মানিত নবীগণ, ওলীগণ, আলিমগণ হক্বক্বানী পীর-মাশাইখ, হাজর-ই আসওয়াদ, ক্বোরআন মজীদ, খানা-ই কা’বা, রমযানুল মুবারক ও ছোট শিশুরা। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে, রমযান তো বলবে, ‘‘হে খোদা! আমি অমুক বান্দাকে ক্ষুধার্ত-পিপাসার্ত রেখেছি। আজ তার পক্ষে আমার সুপারিশ কবূল করো।’’ আর ক্বোরআন বলবে, ‘‘হে খোদা! আমি তাকে রাতে আরাম করতে দেইনি। তার পক্ষে আমার সুপারিশ কবূল করো।’’ সুতরাং এ দু’টির সুপারিশ ক্ববূল হবে। মৌং আবদুল হাই সাহেব ‘হিদায়ার মুক্বাদ্দামাহ্’ (ভূমিকা)য় হাকিমের বর্ণনার বরাতে লিখেছেন, যখন ফারূক্ব-ই আ’যম হাজরে আস্ওয়াদকে বলেছিলেন, ‘‘তুমি নিছক একটি পাথর। তুমি কারো না অপকার করতে পারো, না উপকার। যদি আমি হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লøাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামকে তোমাকে চুম্বন করতে না দেখতাম, তবে আমি কখনো তোমাকে চুম্বন করতাম না।’’ তখন মাওলা আলী রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু বললেন, হযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম এরশাদ করেছেন, ‘‘ক্বিয়ামতে সেটার চোখ ও মুখ হবে এবং হাজীদের পক্ষে সুপারিশ করবে। অঙ্গিকার দিবসে রূহগুলো থেকে যেই অঙ্গিকার নেওয়া হয়েছে, সমস্ত সাক্ষ্য সহকারে তা তাতে সংরক্ষিত রয়েছে। সেটা আল্লাহর আমানতদার এবং মুসলমানদের পক্ষে সাক্ষী। অনুরূপ হুযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, ‘‘যে নারীর তিনটি ছোট শিশু মারা যাবে, তারা তার পক্ষে সাক্ষী হবে, যদি দু’টি মারা যায়, তবে ওই দু’জনই সাক্ষী হবে, আর যদি একটি মারা যায়, তবে ওই একজনই সাক্ষী হবে। আর যদি কেউ মারা না যায়, তবে আমি তার পক্ষে সাক্ষী।’’ বুঝা গেলো যে, ছোট শিশুরাও মাতা-পিতার পক্ষে সাক্ষী হবে।

হুযূর-ই আকরাম শফী‘ঊল মুয্নেবীন

ক্বিয়ামত দিবসে দু’টি অবস্থা হবে- প্রাথমিক পর্যায়ের অবস্থা এবং দ্বিতীয় পর্যায়ের অবস্থা। প্রাথমিক পর্যায়ের অবস্থা হবে আল্লাহ্ তা‘আলার ন্যায় বিচারের। আর দ্বিতীয় পর্যায়ের অবস্থা হবে তাঁর অনুগ্রহের। দ্বিতীয় অবস্থায় সবাই সুপারিশ করবে; কিন্তু প্রাথমিক অবস্থায় শাফা‘আত তো দূরের কথা আল্লাহর দরবারে মুখ খোলারও কেউ সাহস করবে না, হযরত আদম থেকে হযরত ঈসা (আলায়হিমাস্ সালাম)পর্যন্ত সবাই বলবেন, نَفْسِىْ نَفْسِىْ اِذْهَبُوْا اِلى غَيْرِىْ অর্থাৎ ‘‘আজ এখন এ সুপারিশের জন্য আমি নই, তোমরা আমি ব্যতীত অন্য কারো নিকট যাও!’’ কবলেন-

خليل و نجى مسيح وصفى سبى سے كهى كهيں نه بنى

يه بے خبرى كه خلق پرবى كهاں سے كهاں تمهارے لئے

অর্থ: হযরত ইব্রাহীম খলীলুল্লাহ্, হযরত নূহ নাজীউল্লাহ্, হযরত ঈসা মসীহ্, হযরত আদম সফী উল্লাহ্, ক্বিয়ামতবাসী সবাইকে সুপারিশ করতে বলবা। কিন্তু কেউ রাজ হয়নি। এমতাবস্থায় গোটা সৃষ্টি এখান থেকে ওখানে ঘুরে বেড়াবে। এয়া রসূলাল্লাহ্! তাঁরা তো আপনারই তালাশে গোটা হাশরের ময়দানে প্রদক্ষিণ করবা।

দুনিয়ায় তো সবারই জানা আছে যে, হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম গুনাহ্গারদের জন্য সুপারিশকারী (শফী‘ই ‘আ-সিয়াঁ), কিন্তু সেখানে পৌঁছে ইমাম বোখারী ও মুসলিমই নন, বরং সম্মানিত নবীগণ আলায়হিমুস্ সালামের স্মরণেও থাকবে না আজ সুপারিশকারী কে? অবশ্য হযরত ঈসা আলায়হিস্ সালাম বলবেন, ‘‘আমিই হলামও শুকতারা, যে দুনিয়ায়ও তাঁর শুভাগমনের সুসংবাদ দিয়েছি, আজকেও বলছি- হযূর-ই আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লাম এ মুহূর্তে সুপারিশকারী অতঃপর পাপীদের জন্যই সুপারিশকারী।’’ এটা এজন্য ছিলো যে, হয়তো কেউ বলতো, ‘‘এ সুপারিশে হুযূর-ই আকরামের কি-ই বা বৈশিষ্ট্য? এমন সুপারিশ তো অন্য কারো কাছে গিয়ে বললেও হয়ে যেতো!’’ আজ দেখিয়ে দেওয়া হবে যে, অন্য কারো দ্বারা এমন সুপারিশ করা সম্ভবপর নয়। এখন মাহবূব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলায়হি ওয়াসাল্লামই এমন সুপারিশের উপযোগী। প্রত্যেক যায়গায় গিয়ে ধর্ণা দিয়ে দেখো! হুযূর মোস্তফার দরজা ব্যতীত অন্য কোথাও তোমাদের ভিক্ষার ঝুলি পূর্ণ হতে পারে না।

শাফা‘আত (সুপারিশ) তিন প্রকার হবে

১. মর্যাদা বৃদ্ধির জন্য, ২. গুনাহ্ মাফ করানোর জন্য এবং ৩. হাশরের ময়দান থেকে নাজাত দেওয়ার জন্য। এ তৃতীয় প্রকারের সুপারিশের ফলে কাফিররাও উপকৃত হবে। কিন্তু দ্বিতীয় প্রকারের সুপারিশ শুধু মু’মিনদের জন্য প্রযোজ্য হবে। আর প্রথম প্রকারের সুপারিশ থেকে সুন্নাত বর্জনকারীরা বঞ্চিত থাকবে। ফাতাওয়া-ই শামীতে এমনটি বর্ণিত হয়েছে।

যখন জাহান্নাম থেকে ওইসব লোককেও বের করে আনা হবে, যাদের হৃদয়ে সরিষার দানা পরিমাণও ঈমান রয়েছে, তখন মহান রব এরশাদ ফরমাবেন, ‘‘এখন আমার পালা।’’ তিনি আপন কুদরতের অঞ্জলী ভরে কতগুলো জাহান্নামী লোকদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এরা ওইসব লোক হবে, যারা আল্লাহর দরবারে মু’মিন, কিন্তু শরীয়তের দৃষ্টিতে মু’মিন ছিলো না। অর্থাৎ যাদের হৃদয়ে স্বীকারুক্তি এসে গিয়েছিলো। কিন্তু মুখে তা স্বীকার করার সুযোগ পায়নি। অথবা যাদের নিকট নুবূয়তের প্রচারণা পৌঁছেনি। বিবেক দ্বারা আল্লাহর একত্ববাদী হয়েছে, না কাফির ছিলো, না শরীয়ত সম্মত মু’মিন হয়েছে। (দেখুন তাফসীর-ই রূহুল বয়ান, এ স্থানে) কাফিরের জন্য মাগফিরাতের দো‘আ করা হারাম। কারণ এটাও সুপারিশ। এজন্য বালেগ মৃত মুসলমানের জন্য বলা হয়- اَللَّهُمَّ اغْفِرْلِحَيِّنَا وَمَيِّتِنَا অর্থাৎ- ‘হে আল্লাহ্! ক্ষমা করো আমাদের জীবিতকে এবং আমাদের মৃতকে। ’’ যদি এ মৃত মুসলমান হয়, তবে সে দো‘আর অন্তর্ভুক্ত হবে। আর যদি ঈমানের উপর তার শেষ নিঃশ্বাস বের না হয়, তবে এ দো‘আ বহির্ভুত থাকবে। তবে না-বালেগ মৃত এর ব্যক্তিক্রম, সে নিশ্চিত মু’মিন। এজন্য কবরস্থানে গিয়ে বলা হয় دَادَ قَوْمٍ مِّنَ الْمُسْلِمِيْنَ (মুসলামনদের অঙ্গিনার লোকদেরকে সালাম)।

আয়াতুল কুরসীর এ অংশে مَنْ ذَا الَّذِىْ يَشْفَعُ اِلَّا بِاِذْنِه থেকে বুঝা যায় যে, বৃহত্তম শাফা‘আত আল্লাহর অনুমতি প্রাপ্ত খাস বান্দাগণ ব্যতীত কেউ করতে পারবে না। ওই ‘বান্দা-ই খাস’-এর গুণও এযে, তিনি লোকজনের পার্থিব ও পরকালীন অবস্থাদি সম্পর্কে জানেন। কিন্তু অন্য লোকেরা যতটুকু ওই মাহবূব চান ততটুকু ইলমই আয়ত্ব করতে পারবে। [রূহুল বয়ান]

বুঝা গেল যে, হুযূর মোস্তফার দান সবার জন্য সমান, তবে সংগ্রহকারী পাত্র অনুসারে সংগ্রহ করে। যেমন সমুদ্র থেকে কেউ মশক ভর্তি পানি নেয়, কেউ কলসী ভরে নেয়, কেউ অঞ্জলী ভর্তি করে নেয়, কেউ নেয় পেয়ালা ভর্তি করে। যেমনি এখানে কেউ ‘সিদ্দীক্ব’ হয়েছেন, কেউ ‘ফারূক্ব’ ইত্যাদি। আর কোন কোন হতভাগা হয়েছে আবূ জাহল। বাগানে ফুলও থাকে, আবার কাঁটাও। সূর্য-সমানভাবে আলো ছড়ায়; কিন্তু আলোকিত হয় ভিন্ন ভিন্নভাবে। নুবূয়তের জলওয়াও সমানভাবে ছড়ায়, কিন্তু সিদ্দীক্বী ও আবূ জাহলী চোখ পরস্পর ভিন্ন। কবি বলেন-

مصطفے را ديد بوجهل وبگفت – زشت نقشے كز بنى ھاشم شفت

ديد صديقش بگفت اے افتاب – نے ز شرقى نے ز غربى خوش تباب

অর্থ: হযরত মুহাম্মদ মোস্তফাকে আবূ জাহ্ল দেখলো আর বললো, ‘‘বনী হাশেম (গোত্র)-এর এ কেমন অসুন্দর সন্তান!’’ (না‘ঊযুবিল্লাহ্) পক্ষান্তরে তাঁকে হযরত আবূ বকর সিদ্দীক দেখছেন আর বলেছেন, ‘‘ওহে এমন অপূর্ব সূর্য! যা না প্রাচ্যের, না পাশ্চাত্যের। এ কেমন সুন্দর চেহারা!

সুপারিশকারী যার জন্য সুপারিশ করবেন তাকে চেনা জরুরী, যাতে কোন অনুপযুক্ত লোকের জন্য সুপারিশ করা না হয়। আর কোন উপযোগী লোকও যেন সুপারিশ থেকে বঞ্চিত না হয়ে যায়। যেমনিভাবে চিকিৎসকের কোন রোগী চিকিৎসার উপযোগী, কোন রোগীর চিকিৎসা ফলদায়ক নয়- তা জানা দরকার। এজন্য হুযূর-ই আকরাম সাহাবা-ই কেরামকে দু’টি কিতাব (দপ্তর) দেখিয়েছিলেন- যে দু’টিতে জান্নাতী ও দোযখীদের নাম যোগফল সহকারে লিপিবদ্ধ ছিলো। আরেকজন সম্পর্কে যে জিহাদ খুব নিপুণতার সাথে লড়ছিলো, বলেছিলেন, ‘‘এ লোক জাহান্নামী।’’ শেষ পর্যন্ত সে আত্মহত্যা করেছিলো, যা দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, হুযূর আলায়হিস্ সালাতু ওয়াস্ সালাম সৌভাগ্যবান ও হতভাগা- উভয়টি সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। হাউজে কাউসারের নিকট রুখে দেওয়া লোকদেরকে ‘এরা আমার সাহাবী’ বলা তাদেরকে অপমানিত করার জন্যই। অর্থাৎ তারা আমার সাক্ষাৎ পেয়েও আজ হতভাগা। হুযূর-ই আকরাম দুনিয়াতে যেমন জানেন কে জান্নাতী কে জাহান্নামী, আখিরাতেও জানবেন কে শাফা‘আতের উপযোগী আর কে নয়।


রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর মোহরে নবুওয়াত।।

 পরিচ্ছেদঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর দু’কাঁধের মধ্যভাগে মোহরে নবুওয়াত ছিল خاتم অর্থ- আংটি, মোহর, সীল। মোহরে নবুওয়াত হলো রা...